Ad Code

গল্পঃ মূহুর্ত বদল - শেষ পর্ব | লেখক - তাসফি আহমেদ

গল্পঃ মূহুর্ত বদল - শেষ পর্ব | লেখক - তাসফি আহমেদ


গল্পঃ মূহুর্ত বদল - শেষ পর্ব | লেখক - তাসফি আহমেদ

গল্পঃ মূহুর্ত বদল - শেষ পর্ব | লেখক - তাসফি আহমেদ


গল্পঃ মূহুর্ত বদল

(শেষ পর্ব)

 
আমি বাসায় ফিরে নিজেকে রোখাতে পারলাম না আর৷ তিথিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলাম। আমার একমাত্র কান্না করার জায়গা তো সে-ই। তার বুকই আমার শেষ ঠাই। আমি কাঁদি৷ এতো কান্না আমি আর কখনই করিনি৷ মেয়েটার যারপরনাই অবাক হয়। সেও কাঁদে৷ তারপর নিজেকে শক্ত করে৷ আমাকে শক্ত হতে বলে৷ আমাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে রাখে৷ বারবার বলে,
"শোনো, আমি আছি না! আছি তো৷ সব ঠিক হয়ে যাবে৷ তুমি চিন্তা করো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। তিনি নিশ্চয়ই কোনো পথ দেখাবেন৷ তুমি এভাবে কান্না করো না প্লীজ৷"
কতো কথা বলতো মেয়েটা৷ বারবার আমার মাথার কাছে চুমু খেত৷ আমার কপাল, ঠোঁটে এখনও যেন লেপ্টে আছে তার সেই চুমুর স্পর্শ। সে সময়ে মেয়েটা আমার জন্যে একটা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমার একমাত্র উৎসাহ হয়েছে সে। নতুন করে চলার পথ দেখিয়েছে সে৷
"মাহমুদ, এভাবে ভেঙ্গে পড়ো না৷ তোমার উপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে৷ তুমি কিছু না কিছু করতে পারবা। অবশ্যই পারবা৷ এভাবে ভেঙ্গে পড়ো না প্লীজ।"
আমি আসলেই ভেঙ্গে পড়েছিলাম। যে টাকা আমি নেইনি তার হিসেব কোত্থেকে দিবো? এটা কীভাবে সম্ভব হবে?
সেই অসময়ে এই ভেঙ্গে পড়া আমিকে গড়ে তোলে তিথি মেয়েটা। আমাকে আবার পরিপাটি করে চাকরি খুঁজতে বাইরে পাঠায়৷ সেই খোঁজ থেকে ফিরে এলে সে নিজে বের হয়৷ সে একটা চাকরি করবে৷ যার চাকরি যতো আগে হবে ততোই ভালো হয়৷ কারণ আমাদের সেভিংস তেমন নেই৷ বাবুটার জন্যে কিছু টাকা জমা আছে। সেখানে হাত দেওয়া যাবে না৷ তিথি খুন করে ফেলবে৷ কী করার। তিথিও বের হলো। আমি বের হলাম। শেষ ফলাফল কারোই চাকরি হয়নি৷ আমার রিটেন হলেও মাঝে মাঝে ভাইবা দিয়ে কিংবা ভাইবা না দিয়েই চলে আসতে হয়েছে৷ কারণ একটাই। আমার উপর লুটপাটের অভিযোগ। তাদের ভাষায় আমি শিক্ষিত ডাকাত৷ গালমন্দ কিংবা নানান অপমান গিলে নিতে হতো তাদের। সেসব গিলেও হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজেছি। চাকরি এতো সহজ কিছু না৷ আমার জন্যে তো না-ই৷ তাই হয়তো হয়নি। তিথির চাকরি কেন হয়নি জানি না৷ কারন তখন থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন দূরত্ব শুরু হয়েছিল সবে৷ দু'জনেই দু'দিকে মন খারাপ করে পড়ে থাকতাম কেবল। তবে খুব সম্ভবত তিথির চাকরি হয়নি একটা কারণে। কারণ সে বিবাহিত। তাদের আরো এনার্জেটিক ফিমেল এমপ্লয়ি চাই৷ এই জাতীয় কিছু৷
হতাশা এমন এক জিনিস যা আমাদের একদমই নিস্তেজ করে দেয়। আমাদের মাঝে অনিহার সৃষ্টি করে৷ দূরত্ব বাড়ায়৷ ভালোকে খুব সহজে খারাপ করে তোলে। সামান্য খারাপকেও মূহুর্তে সুদীর্ঘ খারাপে পরিণত করে৷ আমাদের বেলায়ও তাই হয়৷ আমরা তীব্র হতাশায় ভুগছিলাম। তাই আমাদের সমস্তই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। আমরা তখন অনির্দিষ্ট দূরত্বে বেঁচে আছি মরার মতো।
একটা সময় তিথি ক্লান্ত হয়ে যায়৷ আমিও ক্লান্ত হয়ে যাই৷ সেই ক্লান্তি থেকে অসহ্য ভাব আসে৷ অসহ্য ভাব মানেই বিরক্তি৷ বিরক্ত থেকেই ঝগড়া৷ ঝগড়া ধীরে ধীরে খুবই সাধারণ হয়ে উঠে আমার জন্যে৷ আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গি হয়৷ ফলস্বরূপ দু'জন দু'বিছানায়৷ মান অভিমান মিটে গেলেও সেটা বেশিক্ষণের জন্যে না৷ আবার কোনো না কোনো ব্যাপারে ঝগড়া চালু হয়ে যায়। যেমন তিথি বলতো,
"অমুক জায়গায় একটা জব সার্কুলার দিয়েছে। দেখ তো একটু?"
আমি সেদিকে না তাকিয়েই বলতাম,
"তুমি আমাকে আবার অপমানিত করতে চাচ্ছো?"
"কেন? এখানে অপমানের কি আছে?"
"এই যে বারবার গিয়ে অপমানিত হচ্ছি, ঘাড় ধাক্কা দিয়ে যে বের করে দেয়, এসব তোমার খুব ভালো লাগে তাই না?"
আমি হয়তো একটু জোরেই কথা বলে ফেলতাম। তিথিও তাই করতো৷ সে যেন কেমন অস্থির। বিষাদ বেদনায় ক্লান্ত। এখান থেকেই শুরু হতো আমাদের ঝগড়ার শুরু৷ যার শেষটা কখনও দু'দিন পর কিংবা সপ্তাখানেক পর হতো৷
প্রথমে আমাদের অল্প অল্প ঝগড়া হতো। যতোই অবিশিষ্ট টাকার পরিমাণ কমতে থাকে ততোই আমাদের ঝগড়া গভীর হতে থাকে৷ আমার অর্থ এবং অফিসিয়াল টেনশন, তিথির সংসার আর বাবুকে নিয়ে টেনশন। দু'জনেই যেন আলাদা ভাবে টেনশন নিয়ে আলাদা একটা জগত তৈরী করে ফেলেছি৷ যে জগতটা আমাদের ঝগড়া করতে ভীষণ সাহায্য করে। ভীষণ!
এই যেমন আজ সকালেও আমাদের মোটামুটি ভালো রকমের একটা ঝগড়া হয়ে গিয়েছে৷
-মাহমুদ?
-হু।
-বাজারে যাও৷
-কী লাগবে?
-বাবুর খাবার নেই৷ খাবার লাগবে৷ তাছাড়া বাসায় আটা নেই৷ রাতে ভাতও রয়নি৷ নাস্তা করার মতো কিছু নেই৷
-এ কথা আগে বলোনি কেন তুমি?
-আগে বললে বোধহয় কিছু ব্যবস্থা করতে পারতে?
-এভাবে কথা বলছো কেন?
-তোমার সাথে কীভাবে কথা বলব? তুমি এমন ভাবে কথা বলছো যেন আগে বললে অনেক কিছু করে ফেলতে পারতে তুমি৷ আর কতো বাকিতে খাবে হ্যাঁ? দোকানদার বাকি দিবে আর? ওখানে তো টাকার পাহাড় দাঁড় করিয়েছো।
-তিথি তোমার আচার ব্যবহার দিন দিন পালটে যাচ্ছে।
-তোমার ঠিক আছে? তোমার তো কথাবার্তার ঠিকঠিকানা নেই। আচার ব্যবহার তো দূরের ব্যাপার।
আমি চুপ করে যাই৷ কিছু সময় চুপ থেকে বলি,
-সাতসকালে এমন চিল্লাচিল্লি না করলে হয় না?
-অহ! এখন আমি চিল্লাচিল্লি করছি? তুমি কিছু করো না? তুমি বোধহয় খুব ধীরে কথা বলো?
আমি আর কথা বাড়ালাম না৷ চুপ করে থাকলাম। তিথি এগিয়ে এসে টেবিলের উপর এক হাজার টাকার একটা নোট রাখল। সাথে বাজারের স্লিপ৷ বলল,
-তাড়াতাড়ি বাজার করে আসো৷
আমি অবাক স্বরে বললাম,
-টাকা কই পেলে?
-জাহান্নাম থেকে পেয়েছি!
আমি খানিকটা ধমক দিয়ে বললাম,
-তিথি, প্রশ্নের জবাব দাও৷
-জবাব শুনে কী করবে তুমি?
-আমি এসব শুনতে চাই না৷ আমি জবাব চাই।
তিথি আমার কথাটা যেন শুনলোই না। বলল,
-এখানে দাঁড়িয়ে এমন ক্যাঁচক্যাঁচ না করে জলদি বাজার করে আনো৷
রাগে আমার গা জ্বলে যাওয়ার মতো অবস্থা৷ আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,
-এই টাকা তোমার বাবা দিয়েছে তাই না?
তিথি খানিকটা চুপ থেকে বলল,
-হ্যাঁ দিয়েছে৷ তো? আমার বাবার টাকা আছে তাই দিয়েছে৷ তোমার সমস্যা কী?
-আমি এই টাকা নিতে পারব না৷ এই টাকা দিয়ে কোনো বাজার এই ঘরে আসবে না।
-কেন? আমার বাবার টাকা তোমার কী ক্ষতি করলো?
আমি খানিকটা চুপ থেকে বললাম,
-আমি কারো দয়ার টাকা চাই না৷
-দয়ার টাকা?
-দয়ারই তো।
-এই দয়ার টাকা দিয়েই এখন চলো। নিজের তো কিছু নেই। এখন এই দয়ার টাকাই দিয়েই চলতে হবে৷ কিছুই করার নেই৷
আমি স্পষ্টই বললাম,
-অসম্ভব। আমি পারব না৷
তিথি ভ্রু কুচকে একটা চিৎকার দিল,
-মাহমুদ? মেজাজ খারাপ করবে না বলে দিলাম। ভালোয় ভালোয় বাজার করে আনো। তা না হলে না খেয়ে মরতে হবে। আমার কথা না ভাবো, বাবুর কথা অন্তত ভাবো৷ ওকে তো বাঁচতে হবে নাকি? শোনো না ক্ষুদায় ছেলেটা কেমন কাঁদতেছে।
বাবু আসলেই কাঁদছিল। সেটা শুনেই আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। আমি চুপ হয়ে গেলাম। কাঁপাকাঁপা হাতে টাকা আর স্লিপটা নিলাম। এরপর দ্রুত বেরিয়ে গেলাম।
.
-কী ব্যাপার? বাথরুম থেকে বের হবে না নাকি? পানির কলটা বন্ধ করছো না কেন? মাহমুদ? এই মাহমুদ?
আমি চট করেই জেগে উঠলাম যেন। চোখেমুখে আবার পানি দিলাম। ভাবনায় এতো তীব্রভাবে হারিয়ে গিয়েছে যে খবরই নেই এখনও বাথরুমে আছি; পানির কল ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ আমি জলদি করে বের হলাম। তোয়ালে দিয়ে হাত মুখ মুছে নিলাম৷ তিথি একটা ট্রে নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। মাল্টা, আপেল, আঙ্গুর এবং এক গ্লাস লেবুর শরবত। সে ট্রেটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো৷ আমি মাথা নিচু করে সেটা নিলাম। সে বলল,
-তোমার আক্কেল জ্ঞান সব গেল বোধহয়। একটা মানুষকে বসিয়ে রেখে কেউ এভাবে বাথরুমে পড়ে থাকে? ছিঃ!
আমি ট্রেটা হাতে নিয়ে তিথির দিকে তাকালাম। কিছু বললাম না। তিথি আর কিছু বলল না৷ পেছন ফিরে হাঁটা ধরলো। আমি ওকে ডাকলাম,
-তিথি?
তিথি না শোনার ভান করে চলে যেতে থাকলো। আমি আবার বললাম,
-তুমি কি এখন আর আমাকে ভালোবাসো না?
তিথি চট করেই দাঁড়িয়ে গেল। পেছন ফিরে আমাকে দেখলো। আমি তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। আমাদের চোখাচোখি হলো৷ কিছু সময় গেল ভীষণ নিরবতায়। আমি তার চোখ দেখলাম। তার চোখের গভীরতা দেখলাম। তারপর চোখ নামিয়ে নিলাম। তার উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে এলাম সেখান থেকে৷ আসার সময় আমার মনে হলো তিথি এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমাকেই দেখছিল৷ আমি তা উপেক্ষা করলাম কেবল।
.
আমি মোটামুটি মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এলাম বসার ঘরে৷ ভদ্রলোক যা-ই বলেন, যেখানেই সাইন করতে বলেন, আমি সাইন করে দিবো। আমি চাই তিথি ভালো থাকুক৷ মুক্ত থাকুক। সে মুক্ত পাখি হোক৷ আবদ্ধ, দমবন্ধকর কষ্ট মেয়েটাকে আর না ছুঁক। অনেক কষ্ট সয়েছে মেয়েটা। আর না৷ আমি তাকে আর কষ্ট পেতে দেখতে চাই না৷ আমি বসার ঘরে এসে হাসলাম৷ বিনয়ী, লজ্জাময় হাসি। বললাম,
-দুঃখিত৷ দেরি করে ফেললাম। ক্ষমা করবেন।
তিনি হাসলেন৷ বললেন,
-সমস্যা নেই।
ভদ্রলোকের সামনে নাস্তার ট্রেটা রাখতেই তিনি বললেন,
-আহা, এসবের প্রয়োজন ছিল না ভাই৷ আমি কিচ্ছু খাব না এখন৷
-একটু নিন৷ সমস্যা নেই৷
-খাবার খাওয়ার সময় নেই আমার মাহমুদ ভাই। আপনার সাথে আমার একটা জরুরি কথা আছে৷ কথাটা বলেই আমি চলে যাবো৷ আর ঘন্টাখানে পর আমার ফ্লাইট। ব্যাবসায়িক কাজে একটু বাইরে যেতে হচ্ছে৷ আপনি প্লীজ কিছু মনে করবেন না৷
-অল্প কিছু হলেও নিন প্লীজ৷
ভদ্রলোক এক টুকরো আপেল নিলেন৷ এরপর পকেট থেকে খামটা বের করলেন৷ খামটা দেখেই আমার মুখটা কেমন শক্ত হয়ে এলো। বুকের ভেতর ধক করে উঠলো চট করেই। এরপরই মনে পড়লো লোকটা ব্যাবসায়িক কাজের কথা বলেছে৷ বাইরে যাচ্ছে। তার মানে সে ব্যাবসা করে? কিসের ব্যাবসা? আশ্চর্য ব্যাপার! উকিলরাও ব্যাবসা করে নাকি?
তিনি খামটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন৷ আমি সেটা নিলাম না৷ তাকিয়ে থাকলাম কেবল৷ অপেক্ষা করলাম কখন ভদ্রলোক আমাকে সব কিছু বিস্তারিত বলবেন, কোথায় সাইন করতে বলবেন। আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম। চরম কষ্টেমাখা এক অপেক্ষা৷ আমার অদ্ভতরকম এক কষ্ট হতে থাকে৷ শূন্যতা অনুভব হতে থাকে। মনে মনে আমি কেন জানি চাচ্ছিলাম তিনি আমাকে সাইন করতে না বলুক৷ আমি খুব চাচ্ছিলাম এটা ডিভোর্স পেপার না হোক৷ এটা অন্য কিছু হোক৷ আমার ফাঁসির আদেশ পত্র হোক এটা৷ তবুও যেন ডিভোর্স পেপার না হয়৷ আমার মরে যাওয়া আর তিথির চলে যাওয়াটা একই ব্যাপার। এই মেয়েটা চলে গেলে আমি বেঁচে থেকেই মরে যাবো।
আমার ভেতরে আবার কেমন জানি বোধ হচ্ছিল। কী অস্বস্তিকর কষ্টদায়ক এক অনুভূতি। অথচ আমি সেটা বিন্দুমাত্র প্রকাশ করতে পারছিলাম না। ভদ্রলোক বললেন,
-খামটা খুলুন।
আমি কাঁপা কাঁপা হাতে খামটা নিলাম। খুলতে ইচ্ছে হলো না৷ তিনি আবার বললেন,
-জলদি খুলুন প্লিজ৷
আমি খামটা খুলে ফেললাম। খোলার পর ভেতরে একটা ছোট্ট কাগজ পেলাম। এটা খালি চেক৷ চেকের কর্ণারে কারো সাইন দেওয়া। আমি অবাক হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। তিনি জলদি করে আমার হাতটা ধরে ফেললেন। বললেন,
-মাহমুদ ভাই, আপনাকে আমি প্রায় দু'বছর থেকে খুঁজছি৷ আজ আপনাকে এখানে পেতে আমার যে কী পরিমান বেগ পেতে হয়েছে তা বলার মতো না৷
আমার অবাক ভাব আরো বেড়ে গেল। আমি ভদ্রলোককে ভালো করে দেখলাম। আশ্চর্য ব্যাপার। তার চোখে পানি৷ তিনি কাঁদছেন৷ আমি বললাম,
-কে আপনি?
-আমি মিনহাজুর রহমান ভূঁইয়া। আমার বাবার নাম আজাদ ভূঁইয়া। আজাদ নামটার কথা মনে পড়ে আপনার?
আমি চট করেই কিছু মনে করতে পারলাম না৷ তবে মনে করার চেষ্টা করলাম৷ তিনি বললেন,
-ভাই, 'আজাদ ভূঁইয়া' নামটা আপনাদের পরিবারের অধঃপতনের সাথে জড়িত৷ আপনাদের এই অবস্থার মূল কারণ৷
আমি ভ্রু কুচকে তাকালাম ভদ্রলোকের দিকে৷ বললাম,
-আপনি সেই আজাদ ভূঁইয়ার ছেলে না যে আমার বাবাকে চাকরি দিবে বলে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছিল?
মিনহাজ সাহেব মাথা নিচু করে নিলেন। আমি বললাম,
-তখনকার পঞ্চাশ হাজার টাকার দাম কতো বোঝেন? আমাদের একটা ধানী জমী বিক্রি করে বাবা ওই টাকা দিয়েছিল৷ ওটা আমাদের অবশিষ্ট সম্বল ছিল। অথচ আপনার বাবা সেই টাকা নিয়ে পালিয়ে গেলেন। তার কোনো খোঁজই পাওয়া যায়নি আর৷ জানেন আমাদের পরিবারের কী হাল হয়েছিল এরপর?
মিনহাজ সাহেব আমার পায়ের উপর পড়ে গেলেন। বললেন,
-ক্ষমা করে দিন ভাই৷ আমার বাবার হয়ে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি৷ তিনি একটা কঠিন ভুল করে ফেলেছেন৷ এটা করা তার ঠিক হয়নি ভাই৷ আমি সে জন্যেই আপনাকে খুঁজছি। এই পাপের দায়ভার থেকে আমার বাবাকে মুক্ত করতে৷ নিজেকে মুক্ত করতে। বিশ্বাস করবেন না ভাই, যখন এই কথাটা শুনলাম, রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। আমার বাবা এমন কাজ করতে পারেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না৷ সেদিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা নেই আপনাদের খুঁজে বের করবো৷ যে কোনো মূল্যেই হোক খুঁজে নিবোই৷
আমি আরো অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। এতো বড় একজন মানুষ চট করেই পা ধরে ফেললে নিজের ভেতরও লজ্জা লেগে যায়৷ আমি বললাম,
-প্লীজ, পাঁ ছাড়ুন৷ আপনি উদার মানুষ। আপনার মতো মানুষও পৃথিবীতে আছে এটা অবিশ্বাস্য। এমনটা আর ক'জনেইবা করে৷ ক'জনেই বা মনে রাখে!
তিনি মাথা তুলে বললেন,
-আমার মা যখন কথাটা বলেছিল আমার মাথায় তখন যেন বাজ পড়লো৷ চিন্তায় পড়ে গেলাম যে আপনাদের অবস্থা কী হবে। কেমন দুরবস্থা হবে! কারণ ভাই, সাংসারিক অভাব আমরাও চরম ভাবে ফেস করেছি। হয়তো আপনাদের অভিশাপ লেগেছে কিংবা আপনাদের মনের ভেতরের কষ্টের শাপ লেগেছে। স্রষ্টা কখনই অবিচার সহ্য করেন না৷ তাঁর সেই অসহ্যটাই আমাদের উপর কাল রূপে এসেছে। যাই হোক, সেটা ছাপিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পেরেছি। জীবনটাকে সুন্দর ভাবে গুছিয়ে নিতে পেরেছি। কিন্তু এক পর্যায়ে যখন আপনাদের ব্যাপারটা জানতে পারলাম তখন তীব্র একটা দুঃখবোধ আমাকে গ্রাস করে নিয়েছিল। কেমন জানি আছেন আপনারা! বাবার অন্যায়টা আপনাদেরকে কতোটা আঘাত দিয়েছে! কীভাবে জানি জীবনযাপন করছেন আপনারা৷ তখন থেকেই খোঁজ নেওয়া শুরু করি। খোঁজ নিতে আপনাদের গ্রামের বাড়িতে যাই। সেখান থেকে জানলাম আপনার বাবা মা দু'জনেই মারা গিয়েছেন৷ প্রথমে বাবা। এরপর মা। আপনি গ্রামে থাকেন না৷ শহরে থাকেন৷ কোথায় তা নিশ্চিত ভাবে কেউ জানে না। খুবই খারাপ লেগেছে ভাই৷ আমি আপনাকে আমার ভেতরের কষ্টটা বোঝাতে পারছি না হয়তো৷ বাট ট্রুলি আই ফিল ইট!
আমি কিছু বললাম না৷ মুখে হাত দিয়ে চুপ করে বসে থাকলাম। আমার সামনের ব্যাক্তিটা কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে৷ আমি কি কাঁদছি? মিনহাজ সাহেব বললেন,
-খালি চেক দিয়ে গেলাম৷ নিজের ইচ্ছে মতো টাকার অংক বসিয়ে নিবেন৷ আলহামদুলিল্লাহ, আপনার এই ভাইয়ের টাকার অভাব নেই৷ তার টাকায় আপনারও হক আছে৷ নিজের টাকা মনে করবেন প্লীজ৷ আর টাকার অংক বসাতে দ্বিধা করবেন না৷ আপনার জন্যে আরেকটা উপর আছে৷ ছোট্ট একটা উপহার৷
কথাটা বলে তিনি আরো দুটি খাম বের করলেন। সেগুলো আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
-এখানে দুটো খাম আছে। একটা আমার কোম্পানির। অন্যটা আপনি যেখানে চাকরি করতেন সেটার৷ একটাতে নিউ জয়েন হবেন। অন্যটাতে রিজয়েন হবেন৷ যেটাতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন৷ আশা করছি আপনাকে আমি আমার কোম্পানিতে পাবো। কারণ আপনার মতো একজন সৎ ব্যক্তি আমার কোম্পানির জন্যে খুব প্রয়োজন। বাকি আপনার ইচ্ছে৷
আমি চুপ করে থাকলাম৷ কী বলব ভেবে পেলাম না৷ মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি৷ এখনই ঘুম ভেঙ্গে যাবে৷ উঠে দেখবো ভোর হয়ে গিয়েছে৷ বাবু কাঁদছে৷ ভোর হলেই বাবুটা ভীষণ কাঁদে৷ ভদ্রলোক আবার বললেন,
-আরেকটা কথা ভাই, এটাকে দয়া ভাববেন না৷ আপনার অধিকার ভাববেন।
আমি এবারেও চুপ করে থাকলাম। তিনি আবার বললেন,
-বেশ, এবার আমাকে উঠতে হবে৷ ফ্লাইট ধরতে হবে৷ আমার কার্ড দিয়ে গেলাম। যে কোনো প্রয়োজনে এই ভাইকে ফোন দিবেন৷ আমি আপনার পাশে আছি৷ আমার কোনো বড় ভাই নেই৷ আপনি আমার বড় ভাইয়ের মতোই৷ আমার ওয়াইফকে নিয়ে একদিন বেড়াতে আসবো। তখন অনেক কথা হবে ভাই৷ আজ আপাতত উঠি৷
ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন৷ আমিও আনমনে উঠে দাঁড়ালাম। ভদ্রলোক দরজার কাছে যেতেই আমি বললাম,
-শুনুন।
তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম,
-আপনি কি স্রষ্টা প্রেরিত কোনো ফেরেশতা?
তিনি ভেজা স্বরে হাসলেন৷ বললেন,
-আমি আপনার ছোট ভাই।
.
মিনহাজ সাহেব চলে গেলেন৷ আমি চুপচাপ সোফায় বসে থাকলাম। কী করবো ভেবে পেলাম না৷ কেমন জানি লাগছে৷ কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে৷ কোথাও যেন কিছু নেই। কী যেন একটা শূন্যতা৷ আমার এখন খুশি হওয়ার কথা৷ মারাত্মক খুশি হওয়ার কথা৷ অথচ আমার সেই খুশিটা হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না? আমি যা চেয়েছি তা পেয়েছি৷ তারচে ভালো কিছু পেয়েছি। অথচ আমার ভেতর তেমন উৎসাহ নেই৷ আনন্দভাব নেই৷ বুকের ভেতর কেমন অস্থিরতা। কী চঞ্চল এক তোলপাড় চলছে যেন৷
হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যান স্যারের নাম্বার৷ আমি কাঁপাকাঁপা হাতে কলটা ধরলাম৷ ওপাশ থেকে স্যারের স্বরটা ভেসে এলো,
-মাহমুদ?
-আসসালামুয়ালাইকুম স্যার।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম। মিনহাজের সাথে কথা হয়েছে?
-জি।
-এখন বাসায় আছো না?
-জি স্যার।
-তোমার বাসার নিচে অফিসের গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে৷ যেভাবে আছো সেভাবেই চলে আসো। কুইক!
আমি কী বলব ভেবে পেলাম না৷ স্যার ফোন কেটে দিলেন। আমি বোকার মতো বসে রইলাম৷ ঠিক সে সময় বাসার কলিংবেল বেজে উঠল। আমার উঠতে মন চাইলো না৷ তাও উঠে গেলাম৷ দরজা খুলতেই দেখলাম আমার বসের গাড়ির ড্রাইভার রেদোয়ান দাঁড়িয়ে আছে৷ সে আমাকে দেখতেই হাসল। বলল,
-স্যার ভালো আছেন?
-আলহামদুলিল্লাহ। তুমি?
-বেশ৷ আপনাকে চেয়ারম্যান স্যার জলদি যেতে বলেছেন৷ যতো জলদি সম্ভব৷
-হ্যাঁ স্যারের সাথে ফোন কথা হয়েছে৷
-জি চলুন৷ আপনার জন্যে দারুণ একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে!
-সারপ্রাইজ?
-জি৷ আসুন আসুন। জলদি যেতে হবে যে! এখন থেকে দৈনিক আপনার বাসায় আসতে হবে স্যার৷ বাসাটা চিনে নিলাম।
আমি বেরিয়ে গেলাম। হঠাৎ, কেন জানি পেছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছে হলো৷ আমি পেছন ফিরে তাকালাম। তাকাতেই দেখলাম তিথি ভেজা চোখে বাবুকে কোলে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ কীভাবে যেন আমাকে দেখছে মেয়েটা৷ আমার বুকটা কেঁপে উঠলো যেন!
.
ঠিক সন্ধ্যা হতেই বাসার উদ্দেশ্যে বের হলাম। নানান কাজ কর্ম হলো অফিসে৷ আমার পদন্নোতি হলো৷ আমার কলিগরা আমাকে এখন স্যার বলে ডাকেন৷ রায়হান ভাই, আমাদের অফিসের ম্যানেজার সহ আরো কয়েজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়৷ এরাই মূলত টাকা গুলো সরিয়েছে৷ আমাকে ফাঁসিয়েছে। এদের এমন কর্মকান্ডের জন্যে অফিস থেকে এদের বহিষ্কার করা হয়েছে৷ কয়েকজন সাংবাদিক এসে একটা ছোটখাটো ইন্টার্ভিউ নিয়ে গেল। সেখানেও বেশ কিছু সময় ব্যয় হয়। সে সব ঝামেলা, কথা বার্তা শেষ করে আসতে আসতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল।
মাত্রই বাসায় এসে পৌঁছালাম৷ কলিংবেল টিপতেই তিথি দরজা খুলে দিলো৷ আমার দিকে না তাকিয়েই রুমের ভেতর চলে গেল৷ আমি কিছু বললাম না। ওয়াশরুমে গেলাম। অনেকক্ষন সময় নিয়ে একটা শাওয়ার নিলাম। জামাকাপড় পালটে আমি সোফায় এসে বসলাম। তিথির কোনো কথাবার্তা নেই৷ অন্য সময় হলে তো ঝগড়া করতো৷ আজ মেয়েটা সেটাও করছে না৷ কেমন জানি শূন্যতা কাজ করছে৷ ঘরভর্তি অসম্ভব নীরবতা। সমস্ত নীরবতা জুড়ে কেমন কষ্ট ভাব, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাগ অভিমান ভেসে বেড়াচ্ছে৷ আমার ভেতরে কেমন অশান্তি। কোনো প্রশান্তি নেই৷ এতো কিছু চট করেই পেয়ে গেলাম তাও মনে হলো কিছুই পাইনি৷ মনে হচ্ছে যেটা খুব মূল্যবান সেটাই পাইনি৷ যেটা এই মূহুর্তে আমার ভীষণ প্রয়োজন সেটা এখনও পাইনি আমি৷ হঠাৎ তিথি ডাক দিলো,
-খেতে এসো।
আমি ধীরে পাঁয়ে উঠে গেলাম। তিথি ভাত বেড়ে দিলো। আমাদের ঝগড়া হোক আর যাই হোক, তিথি সব সময়ই নিজ হাতে ভাত বেড়ে দিবে। নিজ হাতে আমার প্লেটে সব তুলে দিবে৷ তার এই ব্যাপারটা আমার বড় বেশি ভালো লাগে৷ আমি বললাম,
-তুমি খাবে না?
তিথি কিছু বলল না। চুপ করে থাকলো। আমি আবারো বললাম,
-তুমি কি এখনও আমার সাথে কথা বলবে না?
তিথি কিছু বলল না৷ নীরবে স্থান ত্যাগ করলো৷ আমি কিছু সময় ওখানে বসে থাকলাম। তারপর উঠে গেলাম সেখান থেকে৷ ধীরে ধীরে নিজের রুমে গেলাম। মেয়েটা রুমে নেই৷ বাবু ঘুমাচ্ছে। আমি বারান্দার কাছে যেতেই শুনলাম কেউ মুখ চেপে কাঁদছে। কী ভীষণ চাপা কান্নার শব্দ! আমি দ্রুত এগিয়ে গেলাম।
-তিথি!
তিথি হঠাৎ করে থেমে গেল। চট করেই দাঁড়িয়ে গেল সে। আমি বললাম,
-কাঁদছো কেন?
তিথি কিছু বলল না। আমি তার দিকে খানিকটা এগিয়ে গেলাম। সে খানিকটা পিছিয়ে গেল। আমি আবার ডাকলাম,
-তিথি?
সে এবারেও জবাব দেয়নি। আমি বললাম,
-তুমি কি এখন আর আমাকে ভালোবাসো না?
তিথি কান্না শুরু করল আবার৷ আমি আরেকটু কাছে গিয়ে বললাম,
-এতো কাঁদছো কেন?
সে জবাব দিলো,
-মন চাচ্ছে তাই কাঁদছি।
-তুমি কাঁদবে না।
-আমি কাঁদলে নিশ্চয়ই তোমার কিছু যায় আসে না৷
-অবশ্যই যায় আসে৷
-তোমার কিচ্ছু যায় আসে না৷ আমি তোমার কাছে কিছুই না।
-তিথি তুমি নিজেও জানো না তুমি আমার জন্যে কী!
-এবার বেশ টের পেয়ে গেলাম।
-তুমি কিচ্ছু টের পাওনি৷
-যথেষ্ট পেয়েছি৷
-কী টের পেয়েছো?
-তা বলে আর লাভ কী!
-আমাকে জানতে হবে।
-জেনে কী করবে তুমি? কী করতে পারবে?
-তুমি ঠিকই জানো, আমি কী করতে পারব বা পারব না।
-তুমি এখন কিছুই করতে পারবে না মাহমুদ।
আমি খানিকটা চুপ থেকে বললাম,
-তুমি আমাকে এতোটা অকর্মা ভাবো তিথি?
তিথি আমার দিকে তাকালো। ভরা চাঁদের আলোয় আমি স্পষ্ট তার চেহারা দেখলাম। তার চোখের কোণা চিকচিক করছে৷ চোখে জল জমে আছে। সে বলল,
-ভাবতে হচ্ছে৷
আমি থ হয়ে গেলাম। খানিকটা পিছিয়ে এলাম। গ্রিলের কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বললাম,
-বেশ! আমি হয়তো এটারই প্রাপ্য।
কথাটা বলে আমি খানিকটা সময় চোখ বুজে রাখলাম। খানিকটা সময় নীরবতায় পার হতেই বললাম,
-কী পেয়েছো তুমি এখানে। বিষাদ ছাড়া! আমার জন্যে তোমাকে তোমার ফ্যামিলিকে ছাড়তে হয়েছে৷ এই বিচ্ছেদটা কতো বড় ত্যাগ তোমার! কেবল আমার জন্যেই করেছো৷ তা না হলে হয়তো অন্য কোথাও বিয়ে হতো। অন্য কোনো বিলাসবহুল ঘরে৷ কোনো অর্থবান সুপুরুষ তোমার সঙ্গি হতো। তোমার...
তিথি চট করেই বলে ফেলল,
-আমি তোমায় ভালোবেসেছি মাহমুদ। আমি কোনো অর্থবান সুপুরুষ চাইনি৷ আমি মাহমুদকে চেয়েছি। আমি আমার এই হতদরিদ্র মাহমুদকে চেয়েছি।
-চেয়েছো! এখন কী আর চাও না?
তিথি আমার দিকে তাকিয়ে থাকল কেবল। কিছুই বলল না। বলতে পারলো না হয়তো৷ তার চেহায়ার কেমন হতাশ ভাব। সে কেমন ক্লান্ত হয়ে আমায় দেখছে। আমি বললাম,
-তোমার না চাওয়াটাও জায়েজ। তুমি সেই অধিকার রাখো৷ একটা মানুষ কতোটা কষ্ট সইতে পারে!
-আমি কষ্ট সইতে পারি। তবে তোমার বিচ্ছেদ আমার পক্ষে সয়ে নেওয়া সম্ভব না৷
আমি চট করেই যেন থেমে গেলাম। তাকিয়ে থাকলাম মেয়েটার দিকে৷ বললাম,
-তুমি সয়ে নিচ্ছো তো তিথি৷ একা একা কাঁদছো৷ আমার সাথে মিশছো না৷ কথা বলছো না। দূরে দূরে থাকছো৷ এটা কি তোমার সয়ে নেওয়া নয়?
-তুমি কি আমাকে কাছে ঘেঁষতে দিয়েছো? বলো দিয়েছো?
-তুমি কি কাছে আসতে চেয়েছো? আমি স্বীকার করছি যে প্রথম প্রথম তুমি ঠিকই এসেছে। আমিও তোমাকে কাছে টেনে নিয়েছি৷ মান-অভিমান মিটিয়ে নিয়েছি৷ বলো নেইনি?
তিথি জবাব দিলো না৷ মাথা নিচু করে রাখলো৷ মেয়েটা ফোঁপাচ্ছে। আমি বললাম,
-কিন্তু এরপর? যখন আমি গভীর হতাশায় চলে গিয়েছিলাম তখন কী হয়েছিল? তিথি কি আমার পাশে এসেছিল? নাকি সে কেবল এড়িয়ে গিয়েছিল!
তিথি বলল,
-তোমার কাছে ঘেঁষার উপায় কি ছিল মাহমুদ? তুমি তো তখন তোমার চারপাশে শক্ত দেয়াল দাঁড় করিয়েছিলে। আমার প্রতিটি কথার বিপরীত অর্থ খুঁজে নিতে৷ একটা সহজ স্বাভাবিক কথাকে তুমি বৃহৎ করে ফেলতে। বলো করতে না?
-তিথি ওই সময় আমি পাগলের মতো ছিলাম। মাথায় ছয়-সাত লাখের একটা বাড়তি বোঝা! যার কোনো হিসেব আমার কাছে নেই৷ এদিকে আমার হাত খালি হয়ে যাচ্ছিল। আমার তোমার চিন্তা করতে হয়৷ বাবুর চিন্তা করতে হয়৷ আমাদের আগামী দিন গুলোর চিন্তা করতে হয়৷ একটা মানুষ কতো দিক ভাবতে পারে বলো? কতো দিক?
-বেশ! ভাবনা কেবল তোমারই ছিল। আমার ছিল না! অথচ আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি কেবল একটা জিনিস ভেবে যে কীভাবে তোমার মুখে একটু হাসি ফোটানো যায়৷ কীভাবে তোমাকে অল্প কিছুক্ষণের জন্যে হাসিখুশি দেখবো। অথচ আমি এখানে থেকে তোমার জন্যে কিছুই করতে পারিনি। কিছুই না৷ এটা কি আমার জন্যে হতাশার ছিল না? এই যে চাকরির জন্যে ঘুরেও চাকরি পেলাম না, সেটা কি আমার জন্যে খুব সুখকর ছিল?
-আমি তোমার অবদান অস্বীকার করি না৷ করবোও না৷ তুমি চেষ্টা করেছো৷ এই তো আমার সৌভাগ্য। এটা কীভাবে অস্বীকার করি?
-অস্বীকার যে করলে না, তার কোনো প্রমাণ তো আমাকে দাওনি৷ কখনও তো বলোনি, 'তিথি, তুমি হতাশ হয়ো না৷ আমি আছি তোমার পাশে।" বলেছো?
-বলিনি?
-সে সব প্রথম বেলার কথা৷ আমি অন্তিত সময়ের কথা বলছি৷
আমি খানিকটা সময় চুপ থেকে বললাম,
-আমাদের অন্তিম সময়ে আমরা কেউই কারো সঙ্গ দিতে পারিনি তিথি৷ কেউই কাউকে বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি৷
-আমি চেয়েছিলাম বাঁচাতে৷ এক হাজার টাকা দিয়ে তোমার কিছুটা সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। অথচ সেই টাকা আমার বাবা দিয়েছে বলে তুমি সাতসকালে কী রূঢ় আচরণ করলে!
-তুমি করোনি?
তিথি খানিকটা চুপ থেকে বলল,
-কারণ আমি সত্যটা জানতাম না৷ এছাড়া ওই টাকা আমার বাবার ছিল না। ওটা একান্তই আমার টাকা ছিল। আমার জমানো টাকা৷
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম,
-তা কি সত্য জেনেছো তুমি তিথি?
-যে সত্যটা না জানলেই হয়তো আমার জন্যে ভালো হতো৷
-কোন সত্যটা?
তিথি চুপ করে থাকলো। আমি তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম,
-তিথি বলো!
তিথি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। বলল,
-মাহমুদ?
-বলো।
-তুমি এতো বড় কথাটা আমার থেকে কীভাবে লুকালে?
-কোন কথাটা?
তিথি আরো খানিকটা চুপ থেকে বলল,
-আমার বাবার কারণেই যে তোমার চাকরিটা চলে গিয়েছিল!
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো চট করে৷ আমি যেন স্থির হয়ে গেলাম৷ তিথি বলল,
-আমার বাবার যড়যন্ত্রে তুমি চাকরি হারালে। অপমানিত হলে৷ আমাদের যে ছোট্ট সুখটি ছিল সেটা আমার বাবার চোখে বিষের মতো ছিল৷ তিনি তা সহ্য করতে পারেননি। তাই এতো ঘৃণ্য একটা কাজ করছেন। মাহমুদ এই কথাটা তুমি জানতে অথচ আমাকে একবার জানানো প্রয়োজন মনে করলে না৷ এতোটা দূরের ভাবো আমায়?
-তিথি তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে হয়তো!
-চুপ! একদম চুপ! মিথ্যা বলিও না আর৷ আমি সবটা জানি৷ সকালে আসা সেই ভদ্রলোক সবটা বলেছেন৷ তোমার চাকরি কীভাবে গিয়েছে, কেন গিয়েছে, কারা জড়িত সবটা বলেছে। তবে সব শেষে তিনি যখন বাবার নামটা নিলেন আমার স্তব্ধ হয়ে গেলাম৷ পৃথিবী অসাড় লাগছিল তখন মাহমুদ। মনে হচ্ছিল মরে যাই৷ আমার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই৷ আমার মরে যাওয়া উচিৎ।
-তিথি, বাজে কথা বলবা না বলে দিলাম। তুমি মরে কি আমাকেও মেরে ফেলতে চাও?
-মাহমুদ, আমি এই কষ্ট কীভাবে সই বলো? নিজের বাবাই যেখানে আমাকে শত্রু বানিয়ে ফেলেছে!
-তিনি আমাকে পছন্দ করেন না। সে জন্যেই হয়তো করেছেন। তিথি, আমরা এসব নিয়ে আর কথা বলব না৷ আর কোনো কথাই বলব না৷
-তুমি আমাকে চুপ করিয়ে কথাটা চাপা দিতে পারবে৷ অথচ আমার ব্যাথা? তাকে কীভাবে চুপ করাবে?
-আমি ভাগ করে নিবো তিথি। আমাকে কি একটু ব্যাথা দিবে?
তিথি চোখ তুলে চাইলো আমায়৷ আমার চোখের দিকে তাকালো৷ আমিও তার চোখ দেখলাম। তার চোখের গভীরতা দেখলাম৷ বললাম,
-তিথি তোমার চোখে আমি এতো ভালোবাসা কেন দেখি?
-আর তোমার চোখ? তা কী বলে? আমার শূন্যতা নাকি তোমায় পুড়িয়ে মারছে?
-চোখ দেখে বোঝা যায়?
-আমি তোমার চোখ পড়তে জানি। চোখের ভাষা বুঝতে পারি।
আমার চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো চট করেই৷ আমার সামনের তিথিটা কেমন ঝাপসা হয়ে এলো৷ আমি বললাম,
-তিথি?
-হু।
-এই যে, এতো কিছু পেলাম, এতো এতো কিছু, চট করেই যে পেয়ে গেলাম; আমার তো তীব্র রকম খুশি হওয়া উচিৎ। অথচ আমার বিন্দু মাত্র খুশি হচ্ছে না৷ গত দু'দিন থেকে আমি কেন জানি চাকরির কথা ভাবছি না৷ আমি তোমার কথা ভাবছি৷ তোমাদের কথা ভাবছি৷ আমার মাঝে কোনো খুশি নেই৷ আনন্দ নেই৷ কেন নেই?
-শূন্যতা৷ তুমি শূন্যতা বুঝতে পেরেছো৷ তোমার মনের ভেতরের মেঘ সরে গিয়েছে৷ তুমি তোমার শূন্যতাকে বুঝতে পেরেছো৷ অথচ সেই শূন্যতার কাছে এলে না৷ তাকে ধরা দিলে না৷
-তিথি, আমার সেই শূন্যতাটা কি জানো? কে সেই শূন্যতার কারণ?
তিথি চট করেই মাথা নিচু করে নিলো। হঠাৎ তার মাঝে কেমন লজ্জাভাব চট করেই চলে এলো৷ চেহারাময় তার এতো ক্লান্তি-বেদনা, অথচ মূহুর্তে সেখানে লজ্জার রাজ চলে এলো। আমি বললাম,
-আমার তো একটাই শূন্যতা তিথি৷ আমার শূন্যতা তুমি। তোমার অনুপস্থিত আমার একমাত্র শূন্যতা। তোমার স্পর্শ, সঙ্গ, তোমার আলিঙ্গন, তোমার সেই সুমিষ্ট চুমুর ছোঁয়া হচ্ছে আমার একমাত্র শূন্যতা৷ আমার একমাত্র অপূর্ণতা। তুমি জানো না তিথি, আমার ভেতর কেমন হাসফাস। কেমন অক্লান্ত চঞ্চলতা। সব যেন আমার কাছে খালি খালি লাগে৷ শূন্য শূন্য লাগে৷ এই যে এখনও লাগছে৷ কী ভীষণ অপূর্ণতা অনুভব হচ্ছে৷ তিথি তোমার কী এমন অপূর্ণতা অনুভব হয় না? তোমার দম বন্ধ লাগে না?
তিথি মাথা নিচু করে রাখে৷ খানিকটা ফুঁপিয়ে উঠে সে৷ কেমন অস্থিরতা তার মাঝে৷ আমি তার দিকে খানিকটা এগিয়ে গেলাম। তার হাত ধরলাম। আরেকটু কাছে এগিয়ে গেলাম৷ বললাম,
-তিথি আমরা ওসব ভুলেই যাই৷ আমাদের কালটা ভুলে যাই৷ আমরা পেছন ফিরে তাকাবো না আর৷ সামনে এগিয়ে যাবো৷ যতোদূর চোখ যায় এগিয়ে যাবো। তুমি কি আমার পাশে থাকবে তিথি?
তিথি কান্না করে দিল। কাঁদতে কাঁদতে সে তার মাথা দোলালো। ভেজা স্বরে বলল,
-আমার তোমাকেই চাই মাহমুদ। তোমাকেই চাই৷
আমি চোখে জল নিয়ে হেসে ফেললাম। বললাম,
-বুকের ভেতরটা বড় অশান্ত লাগছে তিথি। একটু কি জড়িয়ে ধরবে?
তিথি যেন এই একটা কথার অপেক্ষাই করছিল। কথাটা বলতেই সে আমায় জড়িয়ে ধরলো। শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো আমাকে। বুকের কাছে মাথা রেখে কী অঝোর ধারায় কেঁদে যাচ্ছে মেয়েটা৷ আমি তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে নেই৷ তার মাথার কাছে চুমু খাই৷ কপালে চুমু খাই৷ শেষ চুমু ঠোঁটের কাছে গিয়ে স্থির হয়৷ হঠাৎ সেই শান্ত শীতল, গা কাঁপানো শিহরণ। কতো যুগ পর৷ আমি তিথিকে আমার বুকের সাথে মিশিয়ে রাখি৷ আমার ভেতরের তিক্ততা কেমন হালকা হয়৷ বুক হালকা হয়। কী এক প্রশান্তি যেন আমাকে ছুঁয়ে যায় মূহুর্তে৷ যেন কোনো বোঝ মাথার উপর থেকে সরে গিয়েছে৷ খুব হালকা লাগছে৷ স্বাধীন লাগছে। মনে হচ্ছে অনেক দিন পর তিথিটাকে পেয়েছি৷ আবার সেই পূর্বের তিথিটার মতো করে পেয়েছি৷ আমি নিচু স্বরে বললাম,
-তিথি, তুমি যে আমার একমাত্র সুখ তা কি জানো তুমি? তুমি ছাড়া আমার পক্ষে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটা কঠিন৷ তা কি তুমি জানো?
তিথির ভেজা স্বর ভেসে আসে,
-তাও তো থাকলে। একা একা থাকলে। আমায় ছেড়ে।
-মাঝ রাতে তো রোজ দেখে যেতাম।
-আমি বোধহয় দেখতাম না! কতো রাত তুমি না ঘুমিয়ে কাটিয়েছো!
-আর তুমি? কান্না করে করে৷
-এটাকে আমরা একটা শিক্ষা হিসেবে নেই৷ সামনে এমন অনেক ঝড় আসবে৷ আমরা সেগুলো এক হয়ে সামলে নিবো। নিবো না?
আমি তিথিকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম,
-নিবো৷ অবশ্যই নিবো৷ আমরা দু'জনে মিলে নিবো।


.
ভুলত্রুটি মার্জনীয়।
-তাসফি আহমেদ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ