Bangla Golpo: অবলম্বন। ভালোবাসার গল্পটি লিখেছেনঃ সাদ আহম্মেদ

Bangla Golpo: অবলম্বন। ভালোবাসার গল্পটি লিখেছেনঃ সাদ আহম্মেদ



Bangla Golpo: অবলম্বন। ভালোবাসার গল্পটি লিখেছেনঃ সাদ আহম্মেদ


সাদ আহম্মেদ


রিকসা থেকে নেমে বাসার দিকে এগোতে না এগোতেই চা দোকানের রাসেল ভাই পেছন থেকে ডেকে উঠলেনতার ডাক শুনে আমি এগিয়ে যাই

ভাই হুনছেন নি,বুড়ি তো খুব অসুস্থ

আমি কিছুটা থতমত খেয়ে যাই

কি হয়েছে?”

কি হইসে কইতে পারুম না,তয় বাচব বইলা মনে হইতেসে না

আমি ঠোঁটে কামড় দিইদুশ্চিন্তা ধরলে ঠোঁটে কামড় দেয়া আমার অভ্যাস

প্রাপ্তি কোথায়?”

হের নানির লগেই গ্যাছে

 ঠিকানাটা আপনার কাছে আছে?”

রাসেল ভাই ঠিকানাটা একটা ঠোঙার মধ্যে লিখে দেনএকটা সিএনজি ডেকে উঠে পড়ি দুমাস আগেও আমার জীবনটা অন্যরকম ছিলআর পাঁচ দশটা বেকার ছেলের মত উড়নচন্ডী জীবনবাপের অনেক টাকা আছে,এমন ভাব নিয়ে সারাটা দিন ঘুর ঘুর আর নামে মাত্র ইন্টারভিউ দিতে শহরে শহরে ঘুরে বেড়ানোঠিক এমন জীবনের কোন এক সকালে মোবাইলটা বেজে ওঠে আচমকাইঘুম ঘুম চোখে রিসিভ করি

আপনি কি হাসান সাহেব বলছেন?”

আমাকে সবাই নিনাদ নামেই চিনে হাসান নামটা কেবল সার্টিফিকেটেই ঘুর ঘুর করেতাই আমি উঠে বসি

জি, বলুন

স্যার, আপনাকে আমাদের অফিস থেকে সিলেক্ট করা হয়েছেআপনার জয়েনিং লেটারটা বোধহয় পৌছয় নি তাই স্যার জানিয়ে রাখতে বলেছেন

আমি কুশল বিনিময় করে ফোনটা কেটে দিই চিঠি পৌঁছাতে প্রায় দুটো দিন কেটে যায়একবার পড়েই বাবার হাতে দিইবাবা মনযোগ দিয়ে চিঠিটা দুবার পড়েনস্যলারীর এমাউন্ট, থাকার জন্য একটা বাড়ি শুনে বাবা চমকে যাবে বলেই আশা করেছিলামতা হলো নাবাবা শান্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন

তা কবে যাচ্ছিস?”

মাসের শেষের দিকে

বাবা একটা মলিন হাসি দিলেন যাবার বেলায় মায়ের কান্নাকাটি ছিল দেখার মতবাবা কিছু করেন নি,কেবল কিছু একটা পড়ে মাথায় ফুঁ দিয়ে দিলেন

ভালো থাকিস

বলে মুচকি একটা হাসি দিলেন বাবাসে হাসিতে যেন বিষন্নতা ভরাছেলেদের কাঁদতে হয় না... গাড়ি থেকে নেমে মেজাজটা চরমে উঠলোঅফিস থেকে কোন এক অজ্ঞাত কারনে আমাকে রিসিভ করতে লোক পাঠানো হয় নি লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে এগিয়ে চললাম কাঙ্ক্ষিত ঠিকানার দিকেকখনো বাসে তো কখনো রিকসায়,চার ঘন্টায় তখন ত্রিশ মিনিটের পথ পেরিয়ে এলাম চা দোকানদারের দিকে ছোট কাগজটা এগিয়ে দিই

ভাই ঠিকানাটা কোথায় বলতে পারবেন?”

লোকটা আমার দিকে ভালো করে একবার তাকায়

নতুন জয়েন নিসেন?”

জি

লোকটা দোকান থেকে বেরিয়ে আসেন

আমি রাসেলসবাই আমারে ভাইই ডাহেযে কোন পবলেম আমারে কইবেনআসেন আপনেরে নিয়া যাইলোকটাকে কিছু বলার আগেই ব্যাগটা তুলে নেয়আমাকে পথ দেখাতে দেখাতে নিয়ে চলেন

 এই হইতেসে আহমেদ শরীফের বাসা,ব্যাটায় এত ভালা লোকএত ট্যাহা মাগার কোন অহংকার নাই পোলা ছিল একখান ক্যান্সার হয়া মারা গ্যাসে গতবছরকত খারাপ ভাগ্য দেহেনআল্লাহে যে কি করে ভালা মানুষগো লগে তেনিই জানেনআর রফিক উকিল,শালা খচ্চর একখান বিয়া করসিল বউ চইলা গ্যাসেপ্রতিরাত কত কিছু দেখা যায় শালা লুইচ্চা... ”

কথা বলতে বলতেই বাড়িতে পৌছে যাই লোকটা ব্যাগটা রেখে আমার দিকে তাকানআমি পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে দিইতিনি হেসে ওঠেন

 হুনেন ভাই আরকটা এডভাইস দিই সামনের বাড়িত একটা বুড়ি থাহে পাত্তা দিবেন নাজ্বালাইয়া মারব

আমি সামনের বাড়ির দিকে একবার তাকিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম সময়টা কেমন যেন একঘেয়ে হয়ে উঠলো অফিস,বাসা আর টিভি দেখে দিন পার করে দেয়া-কেমন যেন বিরক্তি ধরে গেলোমাঝেমধ্যে কাছের এক পুকুর পাড়ে যাই,তাও একঘেয়ে ভাব কমে না সেদিন ছিল বুধবার,মাত্র অফিস থেকে ফিরেছি মাগরিবের আজান শেষ হয়েছে অনেকটা সময় হলএমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠেআমি দরজাটা খুলে বাইরে তাকাইবয়স্ক একজন মহিলা,ফোকলা দাঁতে হাসছেন আমার দিকে তাকিয়ে,কি সরলতা মাথার চুলগুলো অনেকটাই নাই হয়ে গেছে,চুল আর চামড়ার রং অনেকটাই এক হয়ে গেছে

নতুন এসেছো?”

আমি মাথা নাড়ি

জি

নাম কি তোমার?”

নিনাদ

ভেতরে আসতে বলবে না?”

আমি সরে দাঁড়াইমহিলা গুটি গুটি পায়ে ঢুকে পড়েন

বাহ অনেক সুন্দর করে সাইজিয়েছো তো

আমি হেসে উঠি প্রায় প্রতিদিনই মহিলা আসতে লাগলেনঅনেকটা সময় কাটিয়ে দিতেন কথা বলে

জানো আজ না আমার জন্যে একটা বিশেষ দিন

আমি অবাক চোখে তার দিকে তাকাতাম

কেন?”

আজ থেকে চুয়ান্ন বছর আগে তোমার নানুর সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল

এত বছর!তাও মনে আছে?”

বারে,থাকবে না কেন?”

সময় এগিয়ে যেতআমি বিরক্তি চোখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতাম আমাকে দেখে রাসেল ভাই হেসে উঠেনহাসেন কেন?”

ভালাই তো তাই না?”

কি ভালো?”

বুড়ির অত্যাচার সইতেসেনভালাই তো

হ্যাঁ ভালোএবার মরেন

চিনির প্যাকেট হাতে নিয়ে হাটা ধরি হঠাৎ করেই মহিলা আসা বন্ধ করে দেন আমি হাফ ছেড়ে বাঁচিএকদিন,দুদিন করে পাঁচদিন পেরিয়ে যায়এবার কেমন যেন দুশ্চিন্তা হয়সিদ্ধান্ত নিই তার বাসায় যাব তৈরি হয়ে সামনের বাসার দিকে এগিয়ে যাইইতস্তত করে কলিংবেল চেপে ধরিকেউ দরজা খোলে না এবার একটু সময় নিয়েই চেপে ধরি ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে যায়একজন মেয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে মাথা বের করে দেয়দেখতে মোটামুটি সুন্দরই বলা যায়চোখজোড়ায় বিশাল সাইজের একটা চশমা বসে আছে সে চশমাকে ফাঁকি দিয়ে চোখ দেখা সম্ভব নয়

কি চাই?”

এই বাড়িতে বোধহয় একজন বয়স্ক মহিলা থাকেন

মেয়েটা আমার দিকে ভালো করে তাকায়

আপনি নিনাদ?”

আমি মাথা নাড়ি

জি

নানু আপনার কথা অনেক বলেনভেতরে এসে বসুন

আমি ভেতরে ঢুকে বসিপুরো ঘরটার দিকে একবার নজর বুলাইকেমন যেন ভৌতিক ভৌতিক ভাব সর্বত্রআসবাবপত ্রগুলো যে কত বছর আগের কে জানে মেয়েটা আমার সামনের চেয়ার টেনে বসে

এস এস সি দিয়েছেন কবে?”

জি?!!”

এস এস সির সাল কত?”

আমি সাল বলি

হুম দু বছরের ছোট

 আমি বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকাই

নানু আপনাকে অনেক বিরক্ত করেতাই না?”

কিছুটা

আমি আশেপাশে একবার তাকাই

উনি কোথায়?”

অসুস্থশ্বাসের সমস্যাটা বেড়ে গিয়েছেআপাতত ঘুমোচ্ছেন

কি যেন ভাবেন তিনি

আম সরি

আমি অবাক হই

কেন!”

এই যে এত বিরক্তির শিকার হনআসলে আমি ফিরি রাত করেবয়স্ক মানুষ তো,একা বোধহয় ভালো লাগে না” “কেন বাসায় আর কেউ নেই?”

মেয়েটা উত্তর করার আগেই ভেতর থেকে কারো আওয়াজ ভেসে আসে

নানু উঠে গেছেন বোধহয়চলুন

মহিলাটা আমাকে দেখে ফিক করে হেসে ওঠেন

আমি বলেছিলাম না সে আসবেদেখলি?”

মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠেনঅসম্ভব সুন্দর হাসি

আমার নাম জানেন?”

আমি মাথা নাড়ি

জি নাহ

জিজ্ঞেস করেন নি যে?”

ভুলে গিয়েছিলাম

আমি মাথা চুলকাইমেয়েটা আবার হেসে ওঠে

প্রাপ্তি

ওহ আচ্ছা

আমি বাসার দিকে হাটা ধরিপেছন ফিরে তাকাই একবারমেয়েটা তখনো হাসছে চায়ে চুমুক দিয়ে রাসেল ভাইয়ের দিকে তাকাই,বিশ্রি স্বাদ

নাহ ভাই আর কেউ নাইবুড়ি আর নাতনীই থাহেমাইয়াটার বাপ মা নাকি ছোটবেলায়ই মইরা গেসিল

লোকটা আমার দিকে একটু এগিয়ে আসে

পছন্দ হইসে টইসে নাকি?”

নারে ভাইজাস্ট কিউরিসিটি

কি?!”

লোকটা মুখ বাঁকা করে

সাধারণ উৎসাহ

ওহ আচ্ছা

লোকটা অনেক কিছু গেলেন এমন একটা ভাব নেন আমি টাকা পরিশোধ করে হাটা ধরি... অনেকটা সময় ধরে কলিংবেলটা বেজে যাচ্ছেআমি দ্রুত হাতে দরজাটা খুলি

ঘুমোচ্ছিলেন নাকি?”

প্রাপ্তি জিজ্ঞেস করে

জি নাহকানে হেডফোন ছিল

 যাই হোকআজ রাতে বাসায় দাওয়াত রইলো

আমি অবাক হয়ে তাকাই

কেন?”

নানুর জন্মদিননানু আপনাকে ছাড়া কেক কাটবে না

খুব ছোট একটা এলবাম,তা পেয়ে যে কেউ এতটা খুশি হতে পারে জানা ছিল নাছোট বাচ্চাদের মত এলবামটা বুকে জড়িয়ে ধরে রাখেন মহিলাটি স্পষ্ট দেখতে পাই তার চোখে অশ্রু প্রাপ্তি আজ শাড়ি পরেছে,নীল শাড়ি খাওয়া দাওয়া শেষে নানু ঘুমোতে চলে যান প্রাপ্তি আমার দিকে ঘুরে তাকান

কাজ আছে?”

আমি মাথা নাড়ি

জি না

চলুন ছাদে যাওয়া যাক

আমি মানা করি না ছাদের অবস্থা আরো খারাপঅবহেলায় যে কতবছর ধরে আছে কে জানে

আসলে আমি ছাড়া কেউ আর ছাদে আসে না তো তাই এই অবস্থা

মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে

একটা প্রশ্ন করব

আমার দিকে তাকান তিনি

করুন

আপনাদের আত্নীয় স্বজন সবাই কোথায়?”

কি যেন ভাবেন তিনি

বাবা মার প্রেমের বিয়ে ছিলকেউ মেনে নেয় নিএকদিন বাবা মা রোড এক্সিডেন্টে মারা যানতখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর মাত্রকেউ আমার দায়িত্ব নিতে চান নিতখন নানুই আমার দায়িত্ব নেনহাসপাতাল থেকে আমাকে নিজের বাসায় আনেন

মেয়েটা আমার দিকে তাকায়

জানেন আমার না কখনো মনেই হয় না নানুর সাথে আমার কোন রক্তের সম্পর্ক নেইকি অদ্ভুত ব্যাপার,তাই না?” আমি কি বলব বুঝে উঠতে পারি না পরিস্থিতি হালকা করা দরকার

নীলাম্বরী

মুখ ফসকে বলে উঠি মেয়েটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়

মানে?”

একটা চরিত্রযখন লেখালেখি করতাম তখন নীলাম্বরীর প্রেমে পড়েছিলাম নীল শাড়ি পরা এক সাধারণ কোন এক রমনীকেই নীলাম্বরী ধরে লিখে যেতাম

এখন লিখেন না?”

জি না

কেন?নীলাম্বরী কষ্ট দিয়েছে?”

আমি নেড়ে সায় দিইমেয়েটা অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন

আবার লেখা শুরু করুনএবার আমার কাহিনী লিখবেনএমনভাবে লিখবেন যেন পুরোটা কাহিনিতে আমার কোন দুঃখ না থাকেকেবল সুখ আর সুখ

লেখা শেষ করা আর হলো নারাসেল ভাইয়ের কাছ থেকে ঠিকানাটা নিয়ে সিএনজি করে মেডিকেলে পৌঁছে গেলামরুমের ঠিক বাইরে প্রাপ্তি নামের মেয়েটা বসে আছেন আমি তার দিকে এগিয়ে যাইআমাকে দেখে ফিরে তাকান একবার

নানুর এখন খবর কেমন?”

মেয়েটা জবাব দেন নাহেটে আমার সামনে দিয়ে চলে যান ডাক্তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন

নিনাদ কে?”

আমি এগিয়ে আসি

বলুন

উনার হাতে বোধহয় বেশি সময় নেই আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন

বয়স্ক মানুষটিকে এত এত যন্ত্রপাতির মাঝে যেন আরো ছোট লাগছেআমি এগিয়ে তার হাতটা শক্ত করে ধরি ধীরে ধীরে চোখটা খুলেন তিনি

একটা কথা রাখবে?”

বলুন

আমার বুড়িটাকে দেখে রাখবে?”

 আমি শক্ত করে তার হাতটা ধরি একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার চোখের কোণ দিয়েতার হাতটা কেমন যেন শিথিল হয়ে আসে শ্বাস নেয়াটাও বন্ধ হয়ে আসেহাতটা বিছানার পাশে রেখে বেরিয়ে আসি,মেয়েটা বাইরে নেই অনেকটা সময় খোঁজাখুঁজির পর হাসপাতালটার বিশাল মাঠে তাকে খুঁজে পাই হাঁপাতে হাঁপাতে তার পাশে এসে দাঁড়াই

একটা জিনিস খেয়াল করেছেন?”

আমি তার দিকে তাকাই

আকাশে আরেকটা তারা বেড়ে গেছে

আমার দিকে ফিরে প্রাপ্তি

আমার সব কাছের মানুষগুলো তারা হয়ে যায় কেন বলুন তো?বেঁচে থাকাটা কি পাপ?কাউকে ভালোবাসাটা কি পাপ?” আমি তার প্রশ্নগুলোর উত্তর করতে পারি না,কেবল তার হাতটা শক্ত করে ধরি জানি একদিন এই হাতজোড়াও হারিয়ে যাবেতারা হয়ে আকাশে দেখা দিবে,আমার দিকে মিটিমিটি হাসবে-তবুও হাতজোড়া আমি ছাড়তে রাজি নইভালোবাসার মানুষগুলো হয়তো ক্ষণস্থায়ী,ভালো বাসা চিরজীবী এক অদৃশ্য অবলম্বন যাকে ধরে আমরা বেঁচে থাকি বাঁচতে চাই,কারো অবলম্বন হয়ে,কাউকে অবলম্বন হিসেবে নিয়ে... .

মুর্তজা সাদ (সাদ আহম্মেদ।)



Bangla Golpo: গল্পঃ মেয়েটি   

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url