Ad Code

গল্পঃ অর্থি। দ্বিতীয় পর্ব। লিখেছেন - তাসফি আহমেদ

গল্পঃ অর্থি। দ্বিতীয় পর্ব। লিখেছেন - তাসফি আহমেদ

গল্পঃ অর্থি। দ্বিতীয় পর্ব। লিখেছেন - তাসফি আহমেদ


গল্পঃ অর্থি। দ্বিতীয় পর্ব। লিখেছেন - তাসফি আহমেদ


পরের সময় গুলো বেশ অন্য রকম ভাবে কাটলো। অর্থি ওদের সাথে ব্যস্ত হয়ে পড়লো৷ নানান কথায় সে সন্ধ্যে পার করে দিলো৷ আমরা যেই ঘরটায় গেলাম সেখানে দেখলাম সকলেই অর্থিকে বেশ পছন্দ করে৷ তাকে চেনে৷ তারা অর্থিকে পেতেই নানান গল্প জুড়ে দিলো৷ নারীরা এক সাথে কথা বলা শুরু করলে যে এদের কথা বলা শেষ হয় না এই ব্যাপারটা আমি আজ প্রমাণ সমেত বুঝতে পারলাম। আমি বুঝি না৷ এদের এতো কথা কিসের৷ সময় পেরিয়ে যায় অথচ তাদের কথা শেষ হয় না।


বেশ কিছু সময় পর আমার ডাক এলো৷ আমাকে ভেতরের ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো৷ আমি দেখলাম একটা যুবতী মেয়ে বিছানা আধশোয়া অবস্থায় আছে৷ আমাকে দেখতেই সে হাসলো৷ আমিও হাসলাম। আমি লক্ষ্য করলাম মেয়েটির একটা পায়ে মোটা করে ব্যান্ডেজ করা। পাঁয়ের দু'পাশ থেকে বালিশ দিয়ে চেপে রাখা। আমি বেশ অবাক হলাম৷ শ্যামলা রঙের এই মেয়েটির এতো মায়াবী হাসিটা দেখে আমার প্রথমে যতোটা না ভালো লাগলো তারচেয়ে বেশি খারাপ লাগলো তার এই অবস্থা দেখে৷ আমার মনটা খারাপ হয়ে এলো৷ মেয়েটি মিষ্টি একটা স্বরে বলল,

-কেমন আছেন?

আমি হেসে জবাব দিলাম,

-ভালো আছি৷ আপনি কেমন আছেন?

- ভালো৷ তা বেশ বড়সড় একটা উপকার করলেন আমার। এই মেয়েটাকে অনেকদিন দেখিনি৷ আজ আপনি ছিলেন বলেই সে এখানে এসেছে৷ তা না হলে আসতো না৷ 

আমি হাসলাম। কী বলব ভেবে পেলাম না৷ চিন্তায় পড়ে গেলাম৷ আমার আসার সাথে অর্থির আসার সম্পর্ক কী? সে আবার বলল,

-আপনি বোধহয় আমাকে চিনতে পারছেন না৷ আমি অর্থির ছোটবেলার বান্ধবী৷ আমার নাম স্মৃতি। 

আমি মৃদু হেসে বললাম,

-আমার পরিচয় এতোক্ষণে নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছেন৷ তাই আর বলছি না৷ আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল। 

এরপর কিছু সময় চুপ থেকে বললাম,

-এখানে আসার পর কেউ একজন এক কাপ চা দিলো৷ চা'টা কে বানিয়েছে বলতে পারবেন?

মেয়েটা আঙ্গুল উঁচিয়ে পেছনের কেউ একজনকে দেখিয়ে বলল,

-আমার মা। 

আমি পেছন ফিরে তাকালাম। বললাম,

-আন্টি আপনি অসাধারণ চা বানান৷ এক কথায় অনবদ্য৷ একদম মায়ের কথা মনে পড়ে গেল! 

আসলেই চা'টা অসাধারণ হয়েছে। আমার এত ভালো লাগল যে বলার মতো না৷ আমার মা এমন অসাধারণ চা বানাতেন৷ চায়ের কালার দেখলেই একদম মন ভরে যেতো! উনার চা'টাও ঠিক তেমন হয়েছে। 


আমরা সেখান থেকে বের হলাম প্রায় সন্ধ্যার পর। দু'জনেই হাঁটছি৷ কেউ কোনো কথা বলছি না৷ হঠাৎ আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগলো৷ আমি বললাম,

-মেয়েটা আসলেই আপনার বান্ধবী? 

-জি। ছোট বেলায় পরিচয়। ওর মা আমাদের বাসায় কাজ করতো তখন। প্রায়ই সে তার মায়ের সাথে আসত৷ সেই সময়েই আমাদের সাক্ষাৎ হয়৷ ধীরে ধীরে  আমরা খুব ভালো বন্ধু হয়ে যাই। 

-কিন্তু মেয়েটার এই অবস্থা কেন? 

অর্থি কিছু সময় চুপ থেকে বলল,

-আসলে ওর বিয়ে হয়ে যায় ক্লাস টেনে থাকতে৷ মেট্রিক দিতে পারেনি৷ ছোট্ট বয়সে মেয়েটা সংসার শুরু করে। অভাব অনটনের সংসার৷ তাই তার মায়ের মতোন সেও বাসায় বাসায় কাজ করা শুরু করে। এই ব্যাপারটা তার স্বামী পছন্দ করেনি। ব্যাপারটা নিয়ে একদিন চরম পর্যায়ে ঝগড়া হয় তাদের। সেদিন ওর বদ স্বামীটা রেগে গিয়ে পিটিয়ে ওর পা'টা ভেঙ্গে দেয়৷  

-মানে? ওই বেটা এমন কেন করলো?

-ছেলেটা ভালো না। নিজেও তেমন রোজকার করতে পারত না৷ আবার স্মৃতিকে দিয়েও কাজ করাতে চাইতো না৷ প্রায়ই গায়ে হাত তুলতো৷ মেয়েটার জীবনটা একদম ধ্বংস করে দিলো বদটা। 

-মামলা টামলা হয়নি?

-ওদের এতো সামর্থ্য নেই যে মামলা করবে৷  এমনিতেই স্মৃতির চিকিৎসায় অনেক টাকা চলে যায়! 

-তাই বলে ওই ছেলেটাকে এভাবে ছেড়ে দিবে? এটা তো অন্যায়৷ ছেলেটার শাস্তি হওয়া উচিৎ। কাজটা ঠিক হয়নি৷ 

-শাস্তি হয়নি বলল কে?

-হয়েছে?

-জি।

-কী শাস্তি?

-স্মৃতির ভরণপোষণের সকল ভার এখন তার কাঁধে৷ স্মৃতি এখন যা চাইবে তা দিতে সে বাধ্য। 

-বাধ্য? কীভাবে বাধ্য হলো? সে তো খারাপ মানুষ। খারাপ মানুষদের এতো ইজিলি বাধ্য করায় যায় নাকি?

-এই ব্যাপারটা আমিও কেন জানি বিশ্বাস করতে পারিনি৷ এখনও পারছি না৷ এখানে কোনো একটা গোপন গল্প আছে৷ যেটা আসলে আমরা কেউই জানি না৷ স্মৃতির মতে তার হাজবেন্ড চট করেই কেমন জানি চেঞ্জ হয়ে গেল। এতো ভালো হয়ে গেল যা বলার মতো না। শুনলাম লোকটা নাকি আজকাল বেশ খাটে৷ পরিশ্রম করে। বাজে কাজে পয়সা উড়ায় না। সময় মতো বাসায় ফিরে। স্মৃতিদের সাথেই থাকে শুনলাম। 

-আশ্চর্য তো! এটা কীভাবে সম্ভব? হঠাৎ কী এমন হলো?

- ঠিক জানি না৷ তবে একদিন স্মৃতিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। স্মৃতি বলল এইসব আকাশ ভাইয়ের কাজ৷ তিনি নাকি ওকে বুঝিয়ে সুজিয়ে সোজা করে ফেলেছেন। 

-বুঝিয়ে সুজিয়ে? এতো ইজি নাকি?

-সেইম আপনার মতো আমারও এই প্রশ্নটা জেগেছিল মনে। উত্তরটা জানার জন্যে এই আকাশ ভাইকে খুঁজে বের করলাম। তার কাছে জানতে চাইলাম তিনি কী এমন করেছেন যে ওই বদ লোকটা এমন চেঞ্জ হয়ে গেল! 

-আকাশ ভাই কী বলেছিলেন?

-তিনি বললেন তিনি আসলে তেমন কিছুই করেননি। তাকে একটু বোঝালেন কেবল। ব্যস৷ এতেই নাকি হয়ে গেল। 

আমি অবাক হয়ে তাকালাম অর্থির দিকে। কিছু বলতে পারলাম না। অর্থি আবার বলল,

-আমি নিজেও আপনার মতো অবাক হয়েছিলাম৷ আকাশ ভাইয়ের কথাটা মনে ধরলো না। আমার মনে হলো তিনি ব্যাপারটা লুকাতেই চাইছেন৷ তবে...

-তবে?

-তবে আকাশ ভাইয়ের সাথে কথা বলে আমার মনে হলো এই মানুষটার কথায় আসলেই জাদু আছে৷ তিনি অল্প কতোক্ষণে আমাকেও ঘোরে ফেলে দিলেন। 

-কী বলেন?

-জি৷ ঠিক তাই৷ যাক, সেসব কথা বাদ৷ এমনিতে আমি উনাকে অনেক রিকোয়েস্ট করেছিলাম যে তিনি আসলে কী করেছেন। কীভাবে এমন চেঞ্জ হলো স্মৃতির স্বামী। আমার বেশ জানতে ইচ্ছে হলো। তাই এতো রিকোয়েস্ট করা৷ এতো রিকোয়েস্টের পর তিনি কী বলল জানেন?

-কী বললো?

-তিনি বললেন, "দেখুন অর্থি, আপনি চান স্মৃতি সুখে থাকুক। আমিও চাই সে সুখে থাকুক। তার সুখের জন্যে আপনি যেমন অনাবিল কাজ করছেন, তাদের খাওয়াদাওয়ায় কিংবা অর্থকষ্টে যেমন কোনো ঘাটতি পড়তে দিচ্ছেন না তেমনি আমিও চাচ্ছি তাদের সুখের মাঝে যেন কোনো ঘাটতি না পড়তে। আমি তাদের সুখের জন্যে কাজ করে যাচ্ছি৷ ব্যস৷ আমাদের দু'জনের কাজের প্রক্রিয়া ভিন্ন৷ কিন্তু লক্ষ্য একই৷ তাই আমাদের উচিৎ এটা ভাবা যে তারা সুখে আছে কি না৷ কোথাও কোনো ঘাটতি আছে কি না। আমাদের মোটেও একে অপরের কাজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভাবা উচিৎ নয়৷ আর সত্যি বলতে ভাবাটাও অনর্থক হবে৷ কারণ আমি তেমন ভারী কিছু করিওনি যে ঘটা করে বলব৷ কেবল বুঝিয়েছি৷ এই যা।" আমি খুব অবাকই হলাম যে তিনি আমার নাম জানেন৷ এমনকি আমাকে আগ থেকেই চেনেন। আমার ব্যাপারে সব জানেন৷ অথচ আমি সেদিন প্রথমবার তার সাথে দেখা করলাম।

আমি কিছুটা অবাক স্বরে বললাম,

-জানাটা স্বাভাবিক না? স্মৃতিদের আত্মীয় বলেই হয়তো জানেন৷ 

-তিনি স্মৃতিদের আত্মীয় নন৷ এমনকি স্মৃতিদের সাথে তার এতো গাঢ় পরিচয়ও নেই৷ এক মাস হলো পরিচয় হয়েছে৷ এতেই তিনি ওদের সবার মন জয় করে নিয়েছেন। ওদের সকল সমস্যা ঠিক করে দিয়েছেন৷ এই অল্প ক'দিনেই৷ ভাবুন একবার! এই মানুষটাকে আমি কেন অসাধারণ বলেছি৷ মানুষটা এতো নিঃস্বার্থ! অচেনা অজানা মানুষদের জন্যে নিঃস্বার্থ ভাবে উপকার করে যাচ্ছেন কেবল৷ 

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম অর্থির দিকে। তারপর বললাম,

-আকাশ ভাইয়ের সাথে এরপর আপনার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়?

-মোটামুটি রকমের হয়৷ 

-তার সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে পেরেছেন?

-জি না৷ তিনি কখনই নিজের সম্পর্কে কিছু বলেননি৷ 

-আশ্চর্য তো! এই মানুষটা তো পুরোই মিস্টিরিয়াস৷ 

-তা ঠিক৷ এই ধরনীর একজন রহস্যময় মানব তিনি৷ 

বলে থামলো অর্থি৷ কয়েক সেকেন্ড পর আবার বলল,

-আপনাকে একটা থ্যাংকস দেওয়ার ছিল। 

-থ্যাংকস? কেন? 

-এই যে আপনাকে নিয়ে এখানে এলাম। আপনি বিরক্ত হচ্ছিলেন। তাও জোর করে নিয়ে এলাম। আসলে এই দিকটা ভালো না৷ একা একা আসতে ভয় করছিল। আকাশ ভাই আসতে পারবে না বলায় ঝামেলায় পড়ে যাই৷ তাই ভাবলাম আপনি যেহেতু আছেন আপনাকে নিয়েই যাই৷ কিন্তু আপনি যে এতোটা বিরক্ত হয়ে যাবেন ভাবিনি৷ এক্সট্রিমলি সরি৷ এন্ড মেনি মেনি থ্যাংকস। 


আমি অর্থির দিকে তাকালাম। কিছু বললাম না৷ সে মাথা নিচু করে হাঁটছে৷ অন্য দিকে তাকাচ্ছে৷ কিন্তু আমার দিকে তাকাচ্ছে না। আমাকে দেখছে না৷ আমরা হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর হেঁটে এলাম। পিচ ঢালা পথে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সময়টা বেশ যাচ্ছিল। এই অসাধারণের মাঝে আমার খানিকটা মন খারাপ হলো৷ অর্থি এতোটা ফর্মাল না হলেও পারতো৷ থ্যাংকস দিয়েছে ভালো কথা। আবার সরি বলতে গেল কেন? আমার সত্যিই মন খারাপ হলো৷ অথচ এখানে মন খারাপ হওয়াটা খুব একটা যুক্তিযুক্ত না। আমি বললাম,

-থ্যাংক্স-সরি এসব আপনার কাছেই রাখুন৷ আমার লাগবে না৷ বরং আপনি একটা থ্যাংকস নিন৷ এতো সুন্দর একটা মূহুর্ত উপহার দিলেন!

-সুন্দর মূহুর্ত? 

-এই যে এদের সাথে সাক্ষাৎ করালেন। মূহুর্তটা কি সুন্দর ছিল না?

-তা ছিল৷ তবে কি জানেন, প্রতিটা সুন্দর মূহুর্তের পেছনে তীব্র ব্যাথাময় একটা ক্লান্তিকর অধ্যায় থাকে। যে ক্লান্তিকর অধ্যায়টি একটা মূহুর্ত তৈরি করে৷ একটি সুন্দর মূহুর্ত। সুন্দর জিনিসটা আসলেই ভীষণ মূল্যবান। 

কথাটা বলে অর্থি আমার দিকে তাকালো৷ কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো৷ অল্প সময়ের জন্যে আমাদের চোখাচোখি হলো৷ ঠিক সেই সময়টায় আমি অন্য রকম কিছু একটা অনুভব করি৷ আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে৷ কেমন শিরশিরে একটা শীতল অনুভূতি হয়৷ আমার মনে হলো এই মেয়েটার গভীর দু'চোখে অদ্ভুত কিছু একটা আছে। কেমন ঘোর ধরানো কিছু একটা৷ মেয়েটা এমন করে তাকালেই বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠে। আমি কিছু সময় বোকার মতো অর্থির দিকে তাকিয়ে থাকি৷ অর্থি নিজেকে সামলে নেয়৷ চোখে ফিরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে হেঁটে যায়। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বলে উঠে,

-একটা কথা বলি?

-বলুন।

অর্থি খানিকটা চুপ থাকলো৷ বলল,

-মানুষ হিসেবে আপনি ভালো৷ কিন্তু আপনার মনের ভেতরে কিছুটা অন্ধকার আছে৷ সেখানে এখনও আলো পড়েনি৷ অথচ আলোটা পড়া ভীষণ জরুরি। 

আমি ভ্রু কুচকে তাকালাম অর্থির দিকে৷ অর্থিও তাকালো আমার দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

-ইগোতে লেগে গেল? 

এবার আমার মেজাজটা গরম হয়ে গেল৷ আশ্চর্য ব্যাপার। এই মেয়ে এসব বলছে কেন? সে কি আমাকে রাগাতে চাচ্ছে? অর্থি আবার বলল,

-আপনি সেল্ফ ডিপেন্ডেবল মানুষ। এই ব্যাপারটা ভালো। তবে নিজে নিজে কিছু ব্যাপারকে খুব জটিল করে ফেলেছেন৷ এটা বড় অন্যায়। 

-আমার কোন ব্যাপার গুলো আপনার কাছে জটিল এবং অন্যায় লাগলো?

অর্থি হাসলো। বলল,

-আপনি কি রাগ করছেন?

-না তো৷ রাগ করব কেন?

-চেহারা দেখে বোঝাই যায় যে রাগ করেছেন।

-আপনি কি চেহারা পড়তে পারেন? চেহারা দেখেই অনেক কিছু বলে ফেলতে পারেন?

-মেয়েরা এমন অনেক কিছুই পারে। যা আপনার ধারণার বাইরে। আপনি জানেনও না মেয়েরা কী কী পারে৷ 

-আমার জানার আগ্রহও নেই৷ 

-যেদিন আগ্রহটা জাগবে সেদিন বেশ দেরি হয়ে যাবে৷ বুঝলেন?

-এতোদিন যেহেতু জাগেনি সেহেতু সামনে জাগবে বলেও মনে হয় না৷ 

অর্থি হাসলো৷ কিছু বলল না৷ কিছু সময় বেশ নীরবে কেটে গেল। আমি বললাম,

-আপনার কী মনে হয়? আগ্রহ জাগবে?

-আমার মনে হওয়া না হওয়া দিয়ে নিশ্চয়ই কিছু যাবে আসবে না। 

-তবুও বলুন৷ 

-বাদ দিন৷ 

-না৷ কোনো বাদ দেওয়া দেওয়ি নেই৷ আপনাকে বলতে হবে।

অর্থি খানিকটা সময় নীরব থাকলো৷ এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

-দেখুন, মানুষ সামাজিক জীব৷ তাই না চাইতেও মানুষকে সমাজের সাথে জড়িয়ে যেতে হয়৷ বলতে গেলে সুস্পষ্ট সমাজ ব্যবস্থা ছাড়া মানুষের জীবনটা অচল৷ আর সমাজটা গঠন হয় মানুষ দিয়ে। মানুষ ছাড়া সমাজের অস্তিত্ব নেই৷ সমাজের আগ্রহেই দেখবেন এক সময়ে আপনার একজন মানুষের প্রয়োজন পড়ে বসবে৷ অবস্থান ভেদে আপনার আগ্রহও জাগবে৷ জাগতে পারে। আমরা মানুষ। আমাদের আবেগ আছে৷ অনুভূতি আছে৷ যে মানুষটা প্রতিটা পদে পদে ম্যাচিউরিটি দেখায় সে মানুষটাকেও মাঝে মাঝে আবেগ বশ করে ফেলতে পারে৷ আসলে আবেগ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ! কোনো কারণে হয়তো আপনার আর আপনার আবেগের মাঝে একটা দেয়াল খাড়া হয়েছে৷ যেটা আপনাকে অনুভব করতে বাধা দেয়৷ এই দেয়ালটা আসলে বেশিদিন টিকবে না। একদিন না একদিন ভেঙ্গে যাবে৷ আপনি এক সময় ঠিকই অনুভব করবেন আপনার একজন মানুষ প্রয়োজন৷ একজন কাছের মানুষ। যার কাছে আপনি নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে প্রকাশ করতে পারবেন৷ যেখানে কোনো দ্বিধা থাকবে না৷ কোনো অস্বস্তি কিংবা বিরক্তিবোধ থাকবে না৷ আপনার একটা সময় কাউকে জরুরি ভাবে প্রয়োজন পড়বে। কোনো এক মন খারাপের দিনে কিংবা ভারী কোনো বৃষ্টির মৌসুমে, ধোঁয়া ওঠা কফির মগে আপনি কাউকে ভীষণ করে চাইবেন৷ আপনারও ইচ্ছে হবে এক মগে করে দু'জনের কফি খাওয়ার৷ প্রিয় মানুষটা মগের যে পাশ দিয়ে চুমুক দিবে আপনিও ঠিক সেই পাশ দিয়ে চুমুক দিবেন৷ আপনার কোলের মাঝে সেই মানুষটাকে আগলে রেখে বৃষ্টি বিলাশ করার লোভ আপনি সামলাতে পারবেন না৷ প্রকৃতি কিংবা অবস্থান মানুষের মনের মাঝে ভীষণ প্রভাব ফেলে৷ এমন ভাবে প্রভাব ফেলে যে মানুষ টেরও পায় না তার মাঝের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তন গুলো। 

কথা গুলো বলে অর্থি থামলো৷ দম নিলো সে৷ আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি৷ ওকে দেখছি৷ অর্থি আবার বলল,

-দেখুন, আপনি আমার সিনিয়র। তাই এভাবে কথা গুলো বলা মানায় না৷ তাও বলছি৷ কারণ আমার মনে হচ্ছে এই ব্যাপার গুলো আপনার জানা উচিৎ। শুনুন, বিয়ে কোনো বোঝা নয়৷ বিয়ে একটা উত্তম প্রতিদান৷ ভালো কিছু সৃষ্টির উৎস। এটি স্রষ্টা প্রদত্ত এমন এক নিয়ম যেটা দু'জন দু'মেরুর মানুষকে এক করে পরিপূর্ণতা দান করে। একটা মানুষ কখনই পরিপূর্ণ হয় না৷ তার মাঝে কোনো না কোনো খুঁত কিংবা অপূর্ণতা থেকেই যায়৷ সেই অপূর্ণতাটাই পূরণ হয় বিয়ের মাধ্যমে। দু'জন সঙ্গির একজন কিছুটা বোকাসোকা হলে অন্যজন দেখবেন ভীষণ চালাক হয়৷ আমি এমন অহরহ দেখেছি৷ এবং এভাবেই মানুষকে সুখে থাকতে দেখেছি৷ কারো অপূর্ণতাকে কারো পূর্ণতা হতে দেখেছি কিংবা কারো পূর্ণতাকে কারো অপূর্ণতা। বিয়েটা আসলেই খারাপ কিছু নয়৷ খারাপ কিছু হতে পারে না৷ এটার মাধ্যমে অবশ্যই ভালো কিছু হওয়া সম্ভব। যদি আপনি সঠিক জীবন সঙ্গিনি বেছে নেন তবে! আপনি অধিকারের কথা বলেছিলেন৷ স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন৷ একজন স্ত্রী কখনই তার স্বামীকে বন্ধী করতে চায় না৷ সে কেবল তার স্বামীকে নিজের করে চায়৷ সকল খারাপ থেকে মানুষটাকে মুক্ত রাখতে চায়৷ সে চায় মানুষটা কেবল তাকে নিয়ে জীবনটা সাজাক৷ তাকে নিয়েই ভাবুক৷ এবং এই চাওয়াটা অন্যায় কিছু না৷ কারণ এটা কল্যান বয়ে আনে৷ কখনও কাউকে আপনার উপর অধিকার খাটানোর অধিকারটা দিয়ে দেখবেন৷ ভালো মন্দ তখন নিজেই টের পাবেন৷ 

এতটুকু বলে অর্থি থামলো। চেহারায় মৃদু হাসির রেখা টেনে ভারী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ আমি কিছু বললাম না৷ চুপ করে থাকলাম। অনেকটা সময় বেশ নীরবতায় কেটে গেল৷ কেউ কোনো কথা বললাম না৷ হঠাৎ অর্থি বলে উঠল,

-আপনি বলেছিলেন না আমি কারো অপেক্ষা করি কি না! আমি আসলেই কেউ একজনের অপেক্ষা করি৷ যাকে আমি আগ থেকেই জানি৷ সত্যি বলতে আমি সেই মানুষটার জন্যেই এতগুলো প্রপোজাল রিজেক্ট করে দিয়েছি৷ আমি কেবল তার জন্যে অপেক্ষা করে গিয়েছি৷ কারণ আমি জানি আমার জন্যে সে-ই পার্ফেক্ট। তার মতো মানুষ হয় না৷ আমার মতে আমি আসলে তার মতো কাউকে এখনও পাইনি৷ সে এখন পর্যন্ত আমার দেখা সেরা একজন৷ 

কথাটা বলে অর্থি হাসলো৷ লজ্জাময় হাসি৷ সে মাথা নিচু করে নিলো৷ আমি বললাম,

-সে নিশ্চয়ই ভাগ্যবান। এটা বলতেই হয়৷ 

অর্থি হাসল। কিছু বলল না। খানিকটা সময়ে নীরবতায় কেটে গেল। এক সময় অর্থি বলল রিক্সা নিতে৷ সে আর হাঁটতে পারছে না৷ আমরা একটা রিক্সা নিলাম। রিক্সা নিয়ে অর্থিদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মাঝ পথে হঠাৎ অর্থি বলল,

-একটা সত্যি কথা বলবেন?

-কী সত্যি কথা? 

-বলবেন কি না বলুন৷

-বলব৷ 

-সত্যিই?

-তিন সত্যি। 

অর্থি খানিকটা নীরব থেকে বলল,

-আমার এমন উশৃংখল আচরণ গুলো আপনাকে খুব বিরক্ত করে তাই না?

কথাটা বলে মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো৷ অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকল। আমি কিছু বলতে পারলাম না। যেন আমি বলার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছি৷ অর্থি চোখ ফিরিয়ে নিল। যেন সে সব বুঝতে পেরে গিয়েছেন৷ একদম সব৷ সে কেমন জানি একটা স্বরে বলল,

-খুব বিরক্ত করে ফেললাম না? 

আমি কিছু বললাম না৷ সত্যি বলতে, বলতে পারলাম না৷ কেবল চুপ করে থাকলাম। অর্থিও কিছু বলল না আর৷ চুপ হয়ে গেল। পুরোটা পথ সে আর কোনো কথা বলল না৷ যাওয়ার সময় কিছু বলেও গেল না৷ রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া দিতে চাইলো৷ আমি দিতে নিষেধ করলাম। সে আর কথা বাড়ালো না৷ বাসায় চলে গেল। আমি সেই রিক্সায় করেই বাসায় ফিরে এলাম৷

.

আসার সময় পুরোটা পথ আমি অর্থির কথা গুলো ভাবলাম। প্রতিটা মূহুর্তই আমি কথা গুলো ভেবে গেলাম। ফ্রেশ হওয়া থেকে শুরু করে এক মগ কফি বানিয়ে বারান্দায় আসা পর্যন্ত প্রতিটি মূহুর্তে। আমি না ভেবেও পারছিলাম না৷ অর্থির কথা গুলো যেন মাথায় সেট হয়ে গিয়েছে৷ আমি যেন এখনও কথা গুলো শুনছি৷ অর্থি বলছে, "শুনুন, বিয়ে কোনো বোঝা নয়..." 


আসলেই কি অর্থি ঠিক বলছে? বিয়ে করাটা কি আসলেই ভালো কিছু? নাকি নিজের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলার এক মাত্র সহজ উপায়। নিজেকে কি স্বইচ্ছায় বন্দী করে ফেলা? আমি ভাবতে থাকলাম। তখনই আমার মনে হলো অর্থি আমার ব্যাপারে প্রায় অনেক কিছুই জানে। বিয়ে কিংবা প্রেম যে আমার বিশেষ পছন্দ নয় তাও সে জানে৷ কীভাবে জানে? তার তো জানার কথা না৷ আমি এই কথা গুলো কাউকেই বলিনি৷ বিশেষ ক'জন ছাড়া৷ তাছাড়া এসব ব্যাপারে কখনই বিস্তর আলোচনা করিনি। তাও এই মেয়েটা জেনে গেল। কীভাবে জানলো? রাশেদের মাধ্যমে? রাশেদ ওকে বলেছে এসব? আমি রাশেদকে ফোন দিলাম। বেটা ফোন ধরলো না৷ বেশ কয়েকবার দিলাম৷ তার রেসপন্স নেই৷ আমি মোবাইলটা বিছানার কাছে রেখে বারান্দায় এলাম। অন্ধকার বারান্দায় বেশ কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকলাম। অনেকক্ষণ পর ফোনটা বেজে উঠল। আমি দৌড়ে ফোনের কাছে গেলাম। স্ক্রিনে দেখলাম রাশেদের নাম। আমি কল রিসিভ করে বললাম,

-কোথায় রে তুই?

-নিকিতাদের বাসায়৷ 

-ওখানে কী করছিস? 

-ও আজ ডিনারে ইনভাইট করল। 

-আচ্ছা শোন৷ তুই কি আমার ব্যাপারে অর্থিকে কিছু বলেছিস?

-কোন ব্যাপারে?

-আমার ব্যাপারে বা আমার ব্যক্তিগত কোনো ইস্যু নিয়ে।

রাশেদ নিরব থাকলো৷

-বলেছিস কিছু?

-দোস্ত আমি বাসায় আসি৷ এলে খুলে বলব৷ 

-আসার দরকার নেই৷ তুই এখন আমাকে বলবি৷ এখনই বলবি।

রাশেদ কিছু সময় নীরব থাকলো৷ ধীরে ধীরে বলল,

-ও একদিন খুব রিকোয়েস্ট করছিল৷ তোর ব্যাপারে জানতে চাচ্ছিল৷ তাইই কথার কথায় বলে ফেললাম! 

-ও জানতে চাইলেই তুই বলে ফেলবি৷  

-রাগছিস কেন? বললে প্রব্লেম কই?

-প্রব্লেম কই মানে? এসব আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ তুই কাছের মানুষ বলেই তোকে বললাম৷ ব্যাপারটা তুই জানিসও৷ তাও কেন বললি? তুই জানিস না এসব আমার অপছন্দ? আমি মানছি আমি কিছুটা অন্য রকম। সবার মতো না৷ আমার চিন্তাভাবনা আলাদা৷ কিন্তু আমার ব্যক্তিগত জিনিস ব্যক্তিগতই থাকে৷ কাউকে বলি না৷ কাছের মানুষ ছাড়া। তারপরও তুই এমনটা করলি? 

-ও রিকোয়েস্ট... 

-রিকোয়েস্ট করলেই বলতে হবে? 

রাশেদ বেশ কিছু সময় চুপ থাকলো। এরপর নিচু স্বরে বলল,

-সরি৷ 

-তোর সরি তোর কাছেই রাখ বেটা৷ আমাকে বলতে হবে না৷ 

-প্লীজ দোস্ত, ও আসলে...

-চোপ! কথা বলবি না একদম। তুই কোনো কথার বলার যোগ্যতাই রাখিস না। ফোন রাখ! 

আমি ফোন কেটে দিলাম৷ মোবাইলটা বিছানার উপর রেখে ফের বারান্দায় এলাম৷ মাথাটা বেশ গরম হয়ে আছে৷ কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। বের হবে নাই বা কেন? আমি আমার ব্যক্তিগত কথাবার্তা কাউকেই বলি না৷ বললেও খুব কাছের কাউকে বলি যারা কখনই এই কথাটা আর কাউকে বলবে না৷ গোপন রাখবে৷ রাশেদ ঠিক তেমনই একজন মানুষ। যার সাথে আমি প্রায়ই অনেক কথা শেয়ার করি৷ সে সবটা জানেও। তারপরও কেন এমন করলো ও? কেন আমার কথা গুলো অন্য কাউকে বলল? 


আমি মেজাজ গরম করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। অনেকটা সময় সেখানে একা একা থাকলাম। বেশ কিছু সময় পর হঠাৎই আমার মনে হলো হায় হায়! আমি এটা কী করলাম? কেন করলাম? ছেলেটার উপর এমন রাগলাম কেন? এখানে এতো রাগার কি আছে? এতোটা না রাগলেও তো পারতাম৷ আশ্চর্য ব্যাপার! আমি হঠাৎ এমন রেগে গেলাম কেন? আমার যেন হঠাৎ বোধ ফিরে এলো৷ আমি বুঝতে পারলাম আসলেই কাজটা আমি ঠিক করিনি৷ বেশ অন্যায় করে ফেললাম! 

.

পরের দিন ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হতেই দেখলাম অর্থি দাঁড়িয়ে আছে। আমি অবাক হলাম না৷ সে আমাদের সাথে আড্ডা দেওয়ার জন্যেই দাঁড়িয়ে আছে এটা নিশ্চিত৷ আজকাল আমাদের আড্ডায় সে একজন নিয়মিত সদস্য৷ আমি তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম৷ সে হাসলো না৷ সে কেমন ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তার চোখের নিচটা কেমন কালচে হয়ে আছে৷ চোখ দুটো বেশ ফোলা ফোলা৷ আমি এবার অবাকই হলাম৷ আমার বুকের ভেতরটা চট করেই ধক করে উঠলো৷ আমার কেন জানি মনে হলো কিছু একটা ঠিক নেই৷ খুব খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে৷ খুবই খারাপ৷ এমনটা কেন মনে হলো তা ঠিক বলতে পারছি না আমি৷ তবে মনে হলো৷ বেশ জোরালো ভাবেই মনে হলো৷ আমি এগিয়ে গেলাম৷ আমি তার কাছে গিয়ে পৌঁছাতেই সে কেমন রূঢ় স্বরে বলল,

-আপনার সাথে কিছু কথা আছে৷ 

-কী কথা? 

-একটু এদিকে আসুন৷ 

আমরা একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। সবার থেকে একটু দূরে, আড়ালে। আমি সেখানে গিয়ে বললাম,

-কী হয়েছে বলেন তো?

অর্থি আমার দিকে বেশ রাগী দৃষ্টিতে তাকালো৷ বলল,

-রাশেদ ভাইকে কী বলেছেন আপনি? 

-কই? কী বললাম?

-কিছুই বলেননি? 

আমি কিছু সময় ভাবলাম। তখনই আমার কাল রাতের কথা মনে পড়ে গেল। আমি চট করেই বললাম,

-রাশেদ কোথায় বলতে পারবেন? কাল রাতে বাসায় আসেনি ও৷ কোথায় গিয়েছে জানিও না৷ ফোন দিলাম তাও ফোন ধরলো না৷ 

-আগে বলুন আপনি উনাকে কী বলেছেন? 

আমি অর্থির দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছু সময়৷ এরপর বললাম,

-একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গেল অর্থি! আমি অযথাই রাশেদের উপর রেগে গেলাম! কাজটা ঠিক হয়নি। 

-যাক! আপনার অন্তত বোধ হয়েছে যে আপনি কাজটা ঠিক করেননি৷ আমি তো ভেবেছিলাম তেমন কিছুও ভাববেন না৷ আপনার যা ইগো! অহংকারে ভরপুর। আপনি মানুষটাকে আমি বেশ ভালো ভেবেছিলাম। কিন্তু আমার ভাবনাটা ভুল প্রমাণিত হলো৷ আপনি ভালো মানুষ নন৷ আপনি হচ্ছে একজন বদ প্রকৃতির লোক। বুঝতে পেরেছেন? আপনি একজন বদ প্রকৃতির লোক!  

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম অর্থির দিকে৷ তার চোখ, গাল কেমন লালচে হয়ে আছে। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। অর্থি এতোটা রেগে আছে? আমি বললাম,

-আমি জানি না আমি কেন এতো রেগে গিয়েছি! আসলে আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার সব সময় ব্যক্তিগত থাকে৷ আমি এসব প্রকাশ করি না৷ তাই রাশেদ আমার ব্যাপারে আপনাকে বলাতে আমার ভীষণ রাগ হলো৷ আমার মনে হলো রাশেদ কাজটা ঠিক করেনি৷ তার কথা গুলো বলা উচিৎ হয়নি।

-তিনি মহান কোনো অন্যায় করেননি৷ তিনি আপনার উপকার করতে চাইলেন৷ তাছাড়া উনি বলতেনও না৷ আমিই রিকোয়েস্ট করলাম। খুব করে রিকোয়েস্ট করলাম। কেন করলাম জানেন?

-কেন?

-কারণ আপনাকে আমি সেই ক্লাস টেন থেকে পছন্দ করতাম৷ রাশেদ ভাইয়াদের বাসায় প্রথম দেখি আপনাকে। কেন জানি না৷ তবে প্রথম দেখাতেই আপনাকে আমার ভালো লেগে যায়৷ এতো ভালো লেগে যায় যে আমি সেদিনই প্রতিজ্ঞা করি, আপনাকে আমি আমার করে নিবো৷ যে কোনো মূল্যে আমার করে নিবো৷ 


আপনি জানেন না, সেই তখন থেকেই আমি আপনাকে ফলো করতাম। আপনার পেছন পেছন ঘুরতাম৷ আপনি আমায় চিনতেন না৷ কিংবা কখনও আমাকে লক্ষ্য করেননি৷ আমি কখনো আপনার এটেনশন পাবার চেষ্টাও করিনি৷ কারণ আমি জানি আমার বয়সটা তখন যথার্থ ছিল না৷ আমার তখন পড়াশোনার সময়। নিজেকে গোছানোর সময়। রাশেদ ভাইয়া জানতেন ব্যাপারটা৷ তিনিও বললেন এখন এই পথে না যেতে৷ একটু অপেক্ষা করতে৷ পড়াশোনায় মনোযোগী হতে। তাই এদিকে আর বেশি আগাইনি৷ আপনাকে বুকের ভেতর রেখে পড়াশোনায় মনোযোগী হলাম আমি৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন কখনও কখনও আপনাকে একবার দেখার জন্যে বুকের ভেতর কী একটা তোলপাড় শুরু হয়ে যেত যা বলার মতোন না৷ কেমন দমবন্ধ লাগতো৷ পাগলাটে আচরণ করতাম। যেন মনে হতো আপনাকে একবার না দেখলে আমি পাগল হয়ে যাবো৷ আমি মরে যাবো৷ একসময় সহ্য করতে না পেরে আপনার কলেজের সামনে এসে উপস্থিত হতাম৷ আপনি জানেন না আমাকে৷ আপনি সেই অর্থিটাকে চেনেন না যে অর্থি আপনাকে ভালোবেসে এই পর্যন্ত নীরব লড়াই করে এসেছে৷ এই যে এই ভার্সিটিতে আমাকে দেখছেন, এক প্রকার যুদ্ধ করে এখানে এসেছি। দিনরাত এক করে পড়েছি। আমার লক্ষ্য ছিল যে করেই হোক, আমাকে এই ভার্সিটিতে এডমিশন নিতে হবে৷ যে কোনো উপায়ে হোক! দেখুন ভাগ্য আমার সহায় হলো৷ তিনটা ভার্সিটিতে চান্স হলো৷ প্রথমটা আপনার এই ভার্সিটিই ছিল এবং কাকতালীয় ভাবে আমাদের বিষয়ও এক! আপনি জানেন সেদিন এই অর্থি কী ভীষণ কান্না করেছে৷ খুশিতে মানুষের হাসার কথা৷ অথচ সে রুম বন্ধ করে দিনরাত এক করে কেঁদেছে৷ তার ভেতর কী অদম্য খুশি৷ অথচ সে হাসতে পারছে না৷ তার হাসি আসছে না৷ চোখ দিয়ে অনায়াসে পানি ঝরছে৷ এটাকেই বুঝি সুখের কান্না বলে! 


এই যে আপনাকে এসে এতো এতো বিরক্ত করতাম, আপনার সঙ্গ পেতে চাইতাম, যেখানে সেখানে আপনাকে দেখলেই দৌড়ে যেতাম, কথা বলতে চাইতাম, কেন চাইতাম জানেন? কেন এতো কাছে যেতাম! কারণ আমার কোনো বাধা ছিল না৷ আমার অনুভূতি এখন আমি নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারবো৷ তাই এতো কাছে যেতাম। আপনাকে বোঝাতে চাইতাম, "ইউ আর স্পেশাল ফর মি!" অথচ আপনি বুঝতেন না৷ বুঝতে চাইতেন না৷ কারণ আপনার বোধশক্তি চাপা পড়ে আছে আপনার ইগোর নিচে৷ আপনি সব সময়ে নিজেকে, নিজের ইগোকে বেশি প্রায়োরিটি দেন৷ তাই কখনই আমাকে বুঝতে পারেননি৷ ভালো ভালো ছেলে গুলোকে রিজেক্ট করে দিয়ে আমি কেন আপনার কাছে ছুটে আসি সেটা আপনি বুঝতে পারেননি। কেন বুঝতে পারছেন না সেটা জানতেই রাশেদ ভাইয়াকে জোর করি আপনার সম্পর্কে বলার জন্যে৷ কারণ তখন আমার কেন জানি মনে হতো আপনি এই প্রেম জিনিসটাকে অপছন্দ করেন। আপনি এসব এড়িয়ে যান৷ তাইই উনাকে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন না৷ কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। শুনেই ছাড়লাম। তবে কথা দিলাম কখনই আপনাকে এসব বলব না। কিন্তু কাল কী হলো জানি না কেন জানি আপনাকে এই ব্যাপারে প্রশ্ন করে ফেললাম। ওটা আমার ভুল ছিল। আমার মহা ভুল ছিল৷ আপনি প্লীজ রাশেদ ভাইয়ের সাথে মিউচুয়াল করে নিয়েন৷ নিজের ইগোটাকে দাবিয়ে রেখে এবারের মতো অন্তত সরি বলাটা শিখে নিয়েন৷ আপনি জানেন না আপনি তাকে কতোটা হার্ট করেছেন৷ আর তিনি হার্ট হয়ে আমাকে কতোটা কথা শুনিয়েছে৷ আমাকে আজ পর্যন্ত কেউই জোর গলায় কথা বলেনি৷ অথচ আজ উনি বললেন। অনেক গুলো কঠিন কথা বললেন৷ কেবল আপনার জন্যেই আমার আমাকে তার অনেক গুলো কথা শুনতে হলো৷ আমার এক মূহুর্তের জন্যে মনে হলো আমি মরে যাই৷ আমার বেঁচে থাকার অধিকার নেই৷ আমি মহা অন্যায় করে ফেলেছি৷ কারো ব্যক্তিগত কথা জেনে ফেলেছি৷ এ আমার মহা অন্যায়৷ আমার মৃত্যুদন্ড হওয়া উচিৎ। 

অর্থি থামলো৷ সে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলো৷ আমি ভালো করে লক্ষ্য করলাম ওকে৷ মেয়েটার চোখে জল জমছে৷ চোখের ভেতরটা কেমন ছিক ছিক করছি৷ অর্থি নরম অথচ বেদনাময় একটা স্বরে বলল,

-আপনাকে ভালোবেসে আমি মহা ভুল করে ফেললাম। এই ভুলটা না করলেও পারতাম। কিন্তু কী করব বলুন! প্রেম তো আর বলে কয়ে হয় না! আপনাকে এতো এতো বিরক্ত করার জন্যে দুঃখি৷ আপনার ব্যক্তিগত অভিমতের উপর নিজের অভিমত চাপিয়ে দেওয়ার জন্যে দুঃখিত৷ ক্ষমা করবেন আমায়৷ 

অর্থি আমার সামনে থেকে দ্রুত চলে গেল৷ আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম৷ তার চলে যাওয়া দেখলাম। মেয়েটা কাঁদছে৷ তার চোখে জল জমে গিয়েছে৷ তার কান্না আসছে৷ সে জন্যেই হয়তো সে দ্রুত চলে গেল৷ তা না হলে আরো কিছু বলে যেতো মেয়েটা৷ আমি সেখানে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করলাম অর্থি চোখ মুছছে। দু'হাত দিয়ে চোখ মুছছে। পেছন থেকে ব্যাপারটা স্পষ্ট বোঝা যায় না৷ তবে কাঁদলে যেমন মানুষ চোখ মোছে অর্থিও তেমন ভাবে মুছছে। আমি গোল চত্ত্বরের কাছে এসে বসলাম৷ অনেকক্ষণ একা একা বসে থেকে আমি উঠে গেলাম৷ আমার মনে হলো আমার রাশেদকে খুঁজে নেয়া উচিৎ। তাকে সরি বলা উচিৎ। তার সাথে আমি ঠিক করিনি৷ বড় অন্যায় করে ফেললাম৷ নিজে যদি অন্যায় করি তবে তার জন্যে সরি বলাই যায়৷ 

.

রাশেদকে খুঁজে বের করতে আমার বেগ পেতে হয়নি৷ তাকে আমি বাসাতেই পেলাম। বিছানায় শুয়ে আছে৷ ঘুমাচ্ছে৷ আমি ওর ঘুম ভাঙ্গালাম না৷ ওর ওঠার অপেক্ষা করলাম। ছেলেটা সন্ধ্যার দিকে উঠলো৷ আমি তাকে জড়িয়ে ধরে মাপ চাইলাম। তাকে বোঝাতে চাইলাম আমি যা করিছি ঠিক করিনি৷ অন্যায় করে ফেলেছি। সে আমার বাল্যকালের বন্ধু৷ তাই হয়তো দ্রুতই আমাকে ক্ষমা করে দেয়৷ আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে "সমস্যা নেই৷ আমি কিছু মনে করিনি।" 


রাশেদের ব্যাপারটা চুকে গেলেও অর্থির ব্যাপারটা রয়ে গেল। আমি ভাবলাম ওকেও একবার সরি বলে নেই৷ যা হয়েছে তার সাথে আমিও যুক্ত। আমার সরি বলা উচিৎ। কিন্তু গত দু'দিন মেয়েটা ভার্সিটি এলো না৷ আমি খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেলাম৷ আমার মনের ভেতর কেমন এক অজানা টান কাজ করল। আমার কেমন জানি অস্থির লাগতে থাকলো। নিজের ভেতর এই অস্থিরতা দেখে বেশ অবাক হলাম। আমি কখনই কারো জন্যে এমন কিছু অনুভব করিনি। অথচ আজ করলাম। ব্যাপারটা অবাককরই। অদ্ভুত এক মন খারাপ নিয়ে আমাকে বাসায় ফিরতে হলো৷ অপেক্ষা ছিল তৃতীয় দিনের৷ মেয়েটা কি কাল ভার্সিটি আসবে? নাকি আমি তার বাসায় চলে যাবো? গেলে কেমন হয়? রাশেদ তো যেতে পারে। ও যাচ্ছে না কেন? ওরও তো সরি বলা প্রয়োজন৷ রাশেদকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করব ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে কী ভেবে যেন আর জিজ্ঞেস করা হয়নি৷ 


পরের দিন ভার্সিটিতে এসেই আমি অর্থিকে খুঁজতে থাকলাম। পেলাম না৷ মেইন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকলাম৷ ও এদিক থেকেই আসবে৷ আমি গেটের কাছে দাঁড়ালেই ওকে পাবো এবং সত্যি সত্যি আমি ওকে পেয়ে গেলাম৷ তার গাড়ি এসে গেটের কাছ থামলো৷ এরপর ধীরে পায়ে সে গেটের দিকে এগিয়ে এলো৷ আমি আমার মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম৷ ও আমাকে দেখলো না৷ আমার দিকে তাকালোও না৷ আমার কাছাকাছি আসতেই আমি তাকে ডাক দিলাম,

-অর্থি? 

অর্থি মনে হয় আমার ডাকটা শুনলো না৷ আসলেই কি শুনলো না? নাকি সে ইচ্ছে করেই জবাব দিলো না৷ আমি পেছন থেকে আবার ডাক দিলাম,

-এই যে, অর্থি? অর্থি?

অর্থি তার মতো করেই হেঁটে চলে গেল। আমার ডাকটা সে শুনলো বলেও মনে হলো না৷ আমার মন খারাপ হলো৷ কেমন এক অস্বস্তি লেগে উঠলো ভেতরে৷ মনে হলো অর্থি এমন না করলেও পারতো৷ অন্তত একবার তার সাড়া দেয়া উচিৎ ছিল। অথচ সে দিল না৷ ইচ্ছেই করে না৷ ক্লাস শেষে আমরা সবাই আড্ডায় বসলাম৷ আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম মেয়েটা এখানে আসবে৷ অথচ সে এখানেও আসলো না৷ আমি উঠে গিয়ে তার ক্লাস চেক করলাম৷ মেয়েটা সেখানেও নেই৷ চলে গিয়েছে। এবার আমার একটু বেশিই মন খারাপ হলো৷ আমার সেই অস্থির ভাবটা চলে এলো৷ কেমন হাসফাস লাগতে শুরু করলো৷ 


দ্বিতীয় পর্ব

.

গল্পঃ অর্থি।

.

ভুলত্রুটি মার্জনীয় 

 -তাসফি আহমেদ


তৃতীয় পর্ব পড়ুন 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ